আকস্মিক বিষক্রিয়ায় যা করবেন

By ডা. হিমেল ঘোষ

December 24, 2020 at 9:45 AM

বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির হৃৎস্পন্দন ও নাড়ির গতিঃ

বাংলাদেশ সহ কৃষি প্রধান দেশ গুলোতে গ্রামাঞ্চলে ফসলের পোকা দমন ও ভালো ফলনের জন্য বিভিন্ন ধরনের কীট নাশক ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে তাই কীট নাশক মজুত থাকে। আর ইহা দিয়ে দুর্ঘটনা বা বিষক্রিয়ার ঘটনাও বাংলাদেশে খুবই পরিচিত সমস্যা।

দুর্ঘটনা জনিত, অসাবধানতা বশত বা ইচ্ছা- কৃত রাসায়নিক কীট নাশকের বিষ ক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে দেশে উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক মানুষ। দুর্ঘটনার কারণে সব চেয়ে বেশি বিষ ক্রিয়ার শিকার হয় শিশুরা।

উৎপত্তি অনুসারে কীট নাশক মূলতঃ দুই প্রকার—অজৈব ও জৈব কীটনাশক। আর্সেনিক, সিসা, সালফার ইত্যাদি অজৈব যৌগ হলো অজৈব কীট নাশক। আর জৈব কীট নাশকের মধ্যে রয়েছে রোটেনন, নিকোটিন প্রভৃতি উদ্ভিজ্জ কীট নাশক এবং ডিডিটি, গ্যামাক্সিন (জৈব ক্লোরিন যৌগ), ম্যালাথিয়ন, প্যারাথিয়ন (জৈব ফসফেট যৌগ), সেভিন, ডায়াজিনন (কার্বামেট যৌগ) প্রভৃতি কৃত্রিম রাসায়নিক।

কেউ ইচ্ছাকৃত কিংবা দুর্ঘটনা বশত বিষ পান করলে কাল বিলম্ব, অপচিকিৎসা বা তথ্য গোপন না করে দ্রুত কাছের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই কিছু প্রাথমিক চিকিৎসা করা উচিত।

কীট নাশকের প্রকৃতি কী ছিল, তা জানতে খালি বোতল বা টিন পাশে থাকলে সেটা সংরক্ষণ করা দরকার। এতে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসায় সুবিধা হবে।

আক্রান্ত ব্যক্তির হৃৎস্পন্দন ও নাড়ির গতি–প্রকৃতি লক্ষ করুন। বিষ ক্রিয়ার উপসর্গ যেমন বমি, পাতলা পায়খানা, মাথা ব্যথা, মাথা ঝিম ঝিম, তন্দ্রা ভাব, অতিরিক্ত ঘাম, কাপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, শ্বাস কষ্ট কিংবা খিঁচুনি আছে কি না, এ সম্পর্কে স্বজনদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

পাশাপাশি রোগীর জ্ঞান রয়েছে কি না অথবা রোগী বমি করলে তা থেকে কোনো রাসায়নিকের গন্ধ বের হচ্ছে কি না—এ বিষয়টিও খেয়াল করুন।

বিষক্রিয়া যেখানে ঘটেছে, প্রথমেই সেখান থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সরিয়ে আলো- বাতাসে ভরা খোলামেলা স্থানে নিতে হবে। রোগীর শরীরের জামা কাপড় সাবধানতার সঙ্গে খুলে সরিয়ে দিতে হবে। কারণ কোনো কোনো কীট নাশক জামা কাপড়ে লেগে থাকে ও ত্বকের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করতে থাকে।

এর পর আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ মণ্ডল, হাত-পা কিংবা শরীরের কোনো অংশে কীট নাশক লেগে থাকলে ওই জায়গা সাবান ও পানি দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে।
কীট নাশক কোনো ভাবে চোখে লাগলে দ্রুত চোখে পরিষ্কার পানির ঝাপটা দিতে হবে অন্তত ১৫ মিনিট ।

আক্রান্ত ব্যক্তির যদি জ্ঞান থাকে এবং খিঁচুনি না হতে থাকে, তাহলে পান করা বিষকে পাতলা করার জন্য তাঁকে এক গ্লাস পানি পান করাতে পারেন। যদি বমি ভাব আসে বা বমি হলে পানি পান করানো যাবে না।

আক্রান্ত ব্যক্তি ওপিসি বা কার্বামেট জাতীয় কীট নাশক কিংবা ঘুমের বড়ি, কুইনাইন প্রভৃতি ঔষধ অতিরিক্ত সেবন করে ফেললে তার গলায় আঙুল দিয়ে বা চামচের ভোঁতা প্রান্ত দিয়ে বমি করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

বমি করানোর ভালো উপায় হলো এক গ্লাস পানি বা মিষ্টি তরল পদার্থে এক চা–চামচ এপসম লবণ মিশিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পান করানো । তবে রোগী অচেতন থাকলে বমি করানোর চেষ্টা করবেন না।

আক্রান্ত ব্যক্তি যদি অজ্ঞান হয়ে পড়েন, তাহলে তার শ্বাসনালি খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগী যদি বমি করতে থাকে, তাহলে তার মাথা এক পাশে কাত করে দিতে হবে, যেন বমির পদার্থগুলো মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে পারে এবং যেন ফুস ফুসে প্রবেশ না করে।

এসবের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালে রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুসারে রোগীকে স্টমাক ওয়াশ ও কীটনাশকের অ্যান্টিডোট এবং অন্যান্য ঔষধ দেওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।

যা করা যাবে নাঃ

রোগীকে কখনোই ভিনেগার কিংবা লেবুর রস পান করানো যাবে না। পাশা পাশি যদি রোগী বমি করে থাকে, তাহলে তা–ও পরবর্তী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করার জন্য সংগ্রহ করা উচিত।

অনেকেই বিষ খাওয়া রোগীকে জোর করে বমি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু রোগী যদি পেট্রোল, কেরোসিন, অ্যাসিড বা ক্ষার- জাতীয় কিছু পান করে থাকে, তাহলে রোগীকে বমি করানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।

সতর্ক থাকুনঃ

কীট নাশক শিশুদের হাতের নাগালের বাইরে বদ্ধ ঘরে তালা দিয়ে একটু উঁচুতে বোতলের মুখ ভালো করে বন্ধ করে বা পাত্রের মুখ আটকে সংরক্ষণ করতে হবে।

কীট নাশকের কোনো বোতল বা কৌটা দাঁত দিয়ে কেটে খোলা যাবে না। কীট নাশক স্প্রে করার সময় নলের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে তা ফুঁ দিয়ে পরিষ্কার করা যাবে না।

মাঠে কীট নাশক ব্যবহারের সময় ধূম পান কিংবা কোনো ধরনের খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

কখনোই কোনো খাদ্য দ্রব্যের সঙ্গে মিশিয়ে কীট নাশক বা ইঁদুর মারার বিষ ব্যবহার করবেন না। কারণ, অনেক সময় কেউ না বুঝে অসাবধানতাবশত বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়ে ফেলতে পারে।

মাঠে কীট নাশক প্রয়োগের সময় কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে। কখনোই খালি গায়ে কীট নাশক ব্যবহার করা যাবে না। বাতাসের গতির দিকে স্প্রে না করে বাতাসের গতির বিপরীতে কীটনাশক স্প্রে করতে হবে।

এ ছাড়া কীট নাশক প্রয়োগের পর ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পুকুর বা কোনো জলাশয়ে ধোয়া যাবে না। কাজ শেষে ভালো করে সাবান–পানি দিয়ে হাত–মুখ ধুয়ে নেবেন।

Similar Posts

  • স্ট্রোক হলে

    হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ায়ও যেমন স্ট্রোক হতে পারে, তেমনই শরীরের কোনো অংশ ধীরে ধীরে দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়া, মুখ একদিকে বাঁকিয়ে যাওয়া, মুখ থেকে খাবার ও পানি গড়িয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন যেমন-চিনতে না পারা অপ্রাসঙ্গিক বা আজেবাজে কথা বলা, অকারণে বিরক্ত হয়ে হইচই করা, একদম…

  • হিট স্ট্রোক। কারণ লক্ষণ ও প্রতিকার

    হিট স্ট্রোক গরমের সময় খুবই সাধারন একটি রোগের নাম। আমাদের দেশে এপ্রিল থেকে জুন/জুলাই মাস পর্যন্ত মানুষের মধ্যে এই রোগটি আকস্মিক ভাবে ঘটার সম্ভাবনা থাকে। যেহেতু এই অসুখটি প্রায় না বলেই হানা দেয় সেহেতু এর সম্পর্কে ধারণা থাকলে সহজেই সেই পরিস্থিতি সামলানো যায়। চলুন আজকে এর কারণ, লক্ষণ ও এর প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নেয়া…

  • ঔষধজনিত লিভার সমস্যাঃ

    আমরা প্রতিদিন হরেক রকম খাদ্য গ্রহণ করি। অসুস্থ মানুষদের নানাবিধ রোগের জন্য বিভিন্ন ধরনের ঔষধ সেবন করতে হয়। আমরা খাদ্যনালি দিয়ে যত প্রকারবস্তুই গ্রহণ করি না কেন সব কিছুই প্রাথমিক পরিপাকের পর অন্ত্রের রক্ত নালি দিয়ে প্রথমে লিভারে প্রবেশ করে। এরপর লিভার থেকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটিয়ে তাকে ঋদ পিণ্ডের মাধ্যমে সমগ্র শরীরে ছেড়ে ছেড়ে দেয়া…

  • কিডনিতে পাথর কেন হয়, কী করণীয়ঃ

    পেটের ব্যথা প্রত্যাশিত কিছু নয়, কিন্তু তারপরও সাধারণ কোনো কারণে পেটব্যথা হতে পারে। ব্যথা খুব তীব্র হলে বুঝতে হবে ইহা জটিল কোনো রোগের লক্ষণ। যেমন- কিডনিতে পাথর। এই পাথর মূলত কিডনিতে পুঞ্জিভূত খনিজের শক্ত স্তূপ। শিকাগোতে অবস্থিত রুশ ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার কুগান মনে করেন, ১০ শতাংশ লোকের কিডনিতে পাথর হতে পারে। ৪০…

  • ইউরিক এসিড কি, কেনো হয়, করণীয়

    উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিডের কারণে গেঁটে বাত বা গিরায় গিরায় ব্যথা, উচ্চ রক্ত চাপ, কিডনি অকেজো হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতি দিনের খাবারের মধ্যে কিছু আছে যে গুলোতে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি।  আবার কিছু পুষ্টিকর খাবার আছে যেগুলো ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে, ঔষধের মত কাজ করে। বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা আমিষ খেলে অথবা…

  • ১০ বছর আগে থেকেই হার্ট অ্যাটাকের যে লক্ষণ দেখা দেয়

    হার্ট অ্যাটাক হলো আকস্মিক মৃত্যুর অন্য- তম প্রধান কারণ। ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে পরিচিত হার্ট অ্যাটাক সতর্কতা ছাড়াই ঘটে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, এন- জিনা পেক্টোরিস নামক একটি অবস্থা হার্ট অ্যাটাকের এক দশক আগ থেকেই দেখা দিতে পারে। এনজাইনা পেক্টোরিস কি? মায়ো ক্লিনিকের মতে, এনজিনা পেক্টোরিস হলো করোনারি ধমনী রোগের একটি উপ- সর্গ । প্রায়ই…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *