উইনস্টন চার্চিল
সফল ব্যক্তিদের ব্যর্থতার গল্প –
উইনস্টন চার্চিলের নাম শোনেনি – এমন মানুষ আধুনিক জগতে খুব কমই আছেন।
ব্যর্থতা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “ব্যর্থতা মানেই সব শেষ নয়; ব্যর্থতার পরও এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখতে হবে” বা “সাফল্য মানে উৎসাহ না হারিয়ে এক ব্যর্থতা থেকে আরেক ব্যর্থতায় যাওয়ার যাত্রা” ।
ব্যর্থতা নিয়ে করা সেরা উক্তি গুলোর বেশ কয়েকটি তাঁর কাছ থেকে আসার কারণ, তিনি ব্যর্থতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এই সফল মানুষটির জীবনের অনেকটা জুড়েই আছে ব্যর্থতার গল্প।
রয়্যাল মিলিটারি কলেজে দুইবার ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে তিনি ফেল করেন। ৩য় বার যখন সুযোগ পান, তখন তাঁকে বেছে নিতে হয়েছিল অনেক নিচের একটি ডিভিশন ।তারপর যদিও তিনি নিজের চেষ্টা দিয়ে অনেক ওপরে ওঠেন।
জানলে অবাক হবেন, ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই বক্তার কথা বলতেই সমস্যা হত। বহুদিন তিনি ডিপ্রেশনে ভুগেছেন।
ভাষণ দেয়ার পর সমস্যা হওয়ার কারণে, তাঁর জন্য বিশেষ ঔষধ ও বানাতে হয়েছিল।কিন্তু এর কিছুই তাঁর চেষ্টা করা থামাতে পারেনি।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ৫টি নির্বাচনে হারেন বৃটেনের ইতিহাসের অন্যতম এই রাজনীতিবিদ।
জন্ম, শৈশব ও পড়ালেখাঃ
স্যার উইনস্টন চার্চিলের পুরো নাম উইনস্টন লিওনার্ড স্পেন্সার চার্চিল। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান চার্চিল ১৮৭৪ সালের ৩০ নভেম্বর অক্সফোর্ড শায়ারে দাদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
দাদা জন স্পেন্সার চার্চিল ছিলেন সে সময়কার ডিউক। বাবা বিখ্যাত রাজনীতি- বিদ লর্ড র্যান্ডলফ চার্চিল ও মা জেনি জেরোমের দুই ছেলের মধ্যে উইনস্টন চার্চিলই বড়, ছোট ভাই জ্যাক চার্চিল (১৮৮০-১৯৪৭) মিলিটারি অফিসার ছিলেন।
চার্চিলের শৈশব, কৈশোর দুই-ই কাটে আয়ার ল্যান্ডের ডাবলিন শহরে। তখনকার ডিউক ছিলেন তাঁর দাদা, আর তারই
রাজনৈতিক কর্মকর্তা ছিলেন তাঁর বাবা ।
স্বাধীনচেতা চার্চিল পড়া লেখায় ছিলেন বরাবরই উদাসীন। আর তার ছাপও পড়লো পরীক্ষার ফলাফলে। ১৮৮৮ সালে লন্ডনের হ্যারোও আবাসিক স্কুলে ভর্তি হন।
কিন্তু এর কয়েক সপ্তাহ পরই তিনি যোগদান করেন হ্যারোও রাইফেল কর্পোরেশনে এবং কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন সেনাবাহিনীকে। বাবা-মাকে খুব বেশি কাছে পাননি চার্চিল, তবুও তাঁদের প্রচণ্ড ভালো বাসতেন।
এমনটাও কথিত আছে যে, চার্চিল তাঁর বাবাকে চিনেছেন অন্যদের মুখ থেকে, বাবা-ছেলের ঘনিষ্ঠতা থেকে নয়। মা জেনিন জেরোমও খুব একটা যেতেন না ছেলেকে দেখতে, যদিও চার্চিল প্রায়ই মাকে চিঠি লিখতেন।
তার যখন ২১ বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা মারা যান, যার ফলে বাবা-ছেলের দূরত্বটা কখনোই মেটেনি।
স্যার উইনস্টন চার্চিল একজন ব্রিটিশ লেখক, কূটনীতিবিদ ও রাষ্ট্র নায়ক। তিনি দুবার যুক্ত রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত ছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি বাহিনীকে হারাতে মিত্র বাহিনীর অন্যতম বৃহৎ শক্তি ছিল যুক্ত রাজ্য, যাকে সংগঠিত করে ছিলেন স্যার উইনস্টন চার্চিল । তাঁর রাজ নৈতিক চিন্তা ধারা ও সাহিত্য কর্ম ছিল অনন্য।
সেনাবাহিনীতে যোগদান ও দাম্পত্য জীবনঃ
চার্চিল তাঁর ঘটনাবহুল সৈনিক জীবনকে খুবই উপভোগ করছিলেন । ১৮৯৫ সালের পর ব্রিটেনের চতুর্থ রানীর নিজস্ব অশ্বা রোহী বাহিনীতে যোগদান করেন এবং সুদানের সীমান্তে অবস্থান করেন, যেখানে তিনি অমদুরমানের যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন।
যুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে পাইওনিয়ার মেইল এবং ডেইলি টেলিগ্রাফকে নিয়মিত প্রতিবেদন লিখতেন।
এসকল অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে তিনি লিখেছেন ‘দ্য ম্যালাকান্ড ফিল্ড ফোর্স’ (১৮৯৮), ‘দ্য রিভার’ (১৮৯৯) এর মতো বিখ্যাত বই।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে অধিক সমাদৃত স্যার উইনস্টন চার্চিল সাহিত্য কর্মেও ছিলেন জগত খ্যাত। ১৮৯৯ সালে চার্চিল সেনা বাহিনী ত্যাগ করে মর্নিং পোস্টের একটি রক্ষণ শীল দৈনিক পত্রিকায় যোগদান করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বোয়ার যুদ্ধ চলাকালে একটি স্কাউটিং অভিযানে তিনি আটক হন। মোজাম্বিকের পর্তুগিজ অঞ্চল থেকে ৩০০ মাইল ভ্রমণ করে তিনি আবার ব্রিটেনে ফিরে আসেন।
এই অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর
বই ‘লেডিস্মিথ’ (১৯০০) এ। ১৯০৮ সালে উইনস্টন চার্চিল ক্লেমেন্টিন ওগিলভি হজিয়েরকে বিয়ে করেন। পাঁচ সন্তানের বাবা-মা ছিলেন ইতিহাস খ্যাত এই দম্পতি।
রাজনীতিতে যোগদানঃ
তিনি আসলে বৃটেনের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত রাজনীতি বিদদের একজন।
উইনস্টন চার্চিল১৯০০ সালে ম্যানচেস্টারের ওল্ডহ্যামের কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য হিসেবে যোগ দেন ।
বাবার স্বাধীন চেতনাকে অনুসরণ করে সামাজিক সংস্কারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলেন নিজেকে।
উইনস্টন চার্চিল এই স্বাধীনচেতা ভাবনার সাথে মিল না থাকায় তিনি কনজারভেটিভ পার্টি ছেড়ে ১৯০৪ সালে লিবারেল পার্টিতে যোগ দেন।
১৯০৮ সালে লিবারেল পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বোর্ড অফ ট্রেডের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সদ্য নিযুক্ত চ্যান্সেলর লয়েড জর্জের সাথে নৌবাহিনী সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেন তিনি। এছাড়াও কারাগার ব্যবস্থার জন্য বেশ কিছু সংস্কার সাধন করেন।
তিনিই প্রথম শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি চালু করেন এবং শ্রম বিনিময় ও বেকারত্ব বীমা তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯১১ সালে এডমিরালটির প্রথম লর্ড হিসেবে নিযুক্ত হন উইনস্টন চার্চিল।
ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে আধুনিকায়নে সহায়তা করেন এবং যুদ্ধজাহাজ গুলোতে কয়লা ভিত্তিক ইঞ্জিনের পরিবর্তে তেলে চালিত ইঞ্জিন ব্যবহারের নির্দেশ দেন, যা ছিল একটি অভাবনীয় সিদ্ধান্ত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধঃ
চার্চিল প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের শুরু অবধি নিজ পদে বহাল থাকেন , কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিপদজনক গালি পোলির যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণ দর্শাতে বাধ্য করেন তৎকালীন সরকারকে।
যার দরুন ১৯১৫ সালের শেষের দিকে সরকার থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। অল্প সময়ের জন্য তিনি আবার সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।
১৯১৭ সালে পশ্চিমা ফ্রন্টের রয়েল স্কট ফিউসিলিয়ার্সের যুদ্ধে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ পর্যবেক্ষণে একটি ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব পালন করেন সাবেক এই সেনা সদস্য।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ বছরে তিনি অস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ
১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে । এদিনই চার্চিল এডমিরালটির প্রথম লর্ড ও যুদ্ধ সভার সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৯৪০ এর এপ্রিলে তিনি সামরিক সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত হন।
মে মাসের দিকে জাতীয় সংসদে নরওয়েজিয় সংকটের কারণে প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেইনের উপর সবাই আস্থা হারিয়ে ফেলে। একই কারণে ১৯৪০ সালের ১০ মে রাজা ষষ্ঠ জর্জ চার্চিলকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই জার্মান সেনাবাহিনী নেদারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গ আক্রমণ করে, যা মিত্রবাহিনীর ওপর প্রথম বড় আক্রমণ ছিল।
দুদিন পর অ্যাডলফ হিটলারের জার্মান বাহিনী ফ্রান্সে প্রবেশ করে। ব্রিটেন তখন হিটলারের জার্মান সেনাবাহিনীকে একাই প্রতিহত করে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হওয়ার পর তৎক্ষণাৎ তিনি লেবার, লিবারেল ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতাদের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবানদের নিযুক্ত করেন গুরুত্বপূর্ণ সব পদে।
১৯৪০ সালের ১৮ জুন ‘হাউজ অফ কমন্স’ এ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন স্যার উইনস্টন চার্চিল। ততদিনে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্মিলিত হয়ে গেছেন।
১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে প্রবেশ চার্চিলকে জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী
করে তোলে। তাঁর সুকৌশলী যুদ্ধনীতি ও মিত্র পক্ষের সম্মিলিত জোটের কাছে জার্মান বাহিনী পরাজিত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে সামাজিক সংস্কারের পরিকল্পনা করেন তিনি, কিন্তু তা তিনি সাধারণ জনতাকে বোঝাতে পারেননি।
যার ফলে ১৯৪৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। পুনরায় প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচনে পরাজয়ের ছয় বছরের মধ্যে তিনি প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা হয়ে উঠে ছিলেন এবং বৈশ্বিক সম্পর্কের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলছিলেন।
১৯৪৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র সফরে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘আয়রন কার্টেন’ ভাষণ প্রদান করেন, যা ছিল ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্যের ওপর সতর্কবাণী।
১৯৫১ সালের নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন এবং দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন।
নোবেল বিজয় ও মৃত্যুঃ
১৯৫৩ সালে ২য় রানী এলিজাবেথ স্যার উইনস্টন স্পেন্সার চার্চিলকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন। একই সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৬৫ সালের ১৫ জানুয়ারি গুরুতর স্ট্রোক করেন চার্চিল, এর ঠিক ন’দিন পর ১৯৬৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্রিটেনের এই মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর লন্ডনের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁকে সেন্ট মার্টিন চার্চের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
১৮৭৪ সালে জন্ম নেয়া চার্চিল ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।