ফরমালিন ব্যবহারের ফলে দূষিত হচ্ছে খাদ্য

ব্যবসায়ীরা বাজারে ফরমালিন ব্যবহারের ব্যাপারটা অস্বীকার করলেও পুরান ঢাকার সোয়ারিঘাট বাজারের বেশিরভাগ দোকানেই অবাধে ফরমালিন ব্যবহার করতে দেখা যায়। আড়তগুলো ফরমালিন মিশ্রিত বরফ দ্বারা মাছের গায়ে ফরমালিন প্রয়োগ করছে অভিনব স্টাইলে।

এ ক্ষেত্রে ফরমালিন মেশানো পানি দিয়েই বরফের পাটা বানানো হয়। সেই ফরমালিন বরফের মধ্যেই দিনভর চাপা দিয়ে রাখা হয় মাছ। সাধারণ পানি দিয়ে বানানো বরফ পাটাগুলো ধবধবে সাদা থাকে, ফরমালিন বরফ পাটার রঙ থাকে হালকা বাদামি।

বেকারির অস্বাস্থ্যকর খাদ্য পণ্য
রাজধানীতে যত্র তত্র গড়ে উঠেছে শত শত বেকারি কারখানা। কালি-ঝুলি মাখা প্রতিটি কারখানার ভেতরে-বাইরে কাদাপানি, তরল ময়লা-আবর্জনাযুক্ত নোংরা পরিবেশ। দুর্গন্ধের ছড়াছড়ি।

আশপাশেই নর্দমা ময়লার স্তূপ। মশা-মাছির ভনভন আর একাধিক কাঁচা-পাকা টয়লেটের অবস্থান। কারখানাগুলো স্থাপিত হয়েছে টিনশেড বিল্ডিংয়ে।

বহু পুরনো চালার টিন গুলো স্থানে স্থানে ছিদ্র থাকায় বৃষ্টির পানি অনায়াসেই কার- খানা ঘরে ঢুকে। এতে পিচ্ছিল কর্দমাক্ত হয়ে থাকে মেঝে, কাদাপানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় খাদ্য-সামগ্রীতে, কারখানাগুলোতে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা নেই, দম বন্ধ হওয়া গরম থাকে রাত-দিন গরমে ঘামে চুপসানো অবস্থায় খালি গায়ে বেকারি শ্রমিকরা আটা-ময়দা দলিত মথিত করে। সেখানেই তৈরি হয় ব্রেড, বিস্কুট, কেকসহ নানা লোভনীয় খাদ্য পণ্য।

অভিযোগ আছে উৎপাদন ব্যয় কমাতে এ সব বেকারির খাদ্য পণ্যে ভেজাল আটা, ময়দা, ডালডা, তেল, পচা ডিমসহ নিম্ন মানের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। কেক ও ব্রেড তৈরির জন্য সেখানে পিপার- মেন্ট, সোডা ও ব্রেকিং পাউডার রাখা হয়েছে পাশা পাশি।

বেকারির কারখানায় উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য সতেজ রাখতে ট্যালো, ফ্যাটি এসিড ও ইমউসাইল্টিং, টেক্সটাইল রঙসহ নানা কেমিক্যালও ব্যবহার করতে দেখা যায়। আশ পাশের কারখানা গুলোতে দেদার ব্যবহার হচ্ছে ভেজাল আটা, ময়দা, ডালডা, তেল ও পচা ডিম। বেকারিতে পচা ডিম ব্যবহার যেন সাধারণ বিষয়।

বিষাক্ত এনার্জি ড্রিংক ও জুস। এনার্জি ড্রিংকস বলতে কোনো পণ্যসামগ্রী উৎপাদন বা বাজারজাতের জন্য বিএসটিআই কোনো রকম অনুমোদন দেয় না।

তা সত্ত্বেও অনুমোদন পাওয়ার জন্য একটি আবেদনপত্র বিএসটিআই কার্যালয়ে জমা দিয়েই কারখানায় দেদার উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিএসটিআইয়ের কেমিক্যাল বিভাগের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, যে কোনো ড্রিংকস উৎপাদন ও বোতলজাতের ক্ষেত্রে প্রথম শর্তই হচ্ছে অটো মেশিনে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করা।

নির্ধারিত ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল উপকরণগুলো ফুটিয়ে নিয়ে তা রিফাইন করার মাধ্যমে সংমিশ্রণ ঘটানো এবং বোতলজাত করা থেকে মুখ লাগানো পর্যন্ত সবকিছুই অটো মেশিনে ধারাবাহিক- ভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু কথিত জুস কারখানাগুলোতে সব কিছুই চালানো হচ্ছে হাতুড়ে পদ্ধতিতে।

মসলায় রঙ, ইট ও কাঠের গুঁড়া অধিক মুনাফার আশায় এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী মসলায় কাপড়ে ব্যবহৃত বিষাক্ত রঙ, দুর্গন্ধ যুক্ত পটকা মরিচের গুঁড়া (নিম্নমানের মরিচ) ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, মটর ডাল ও সুজি ইত্যাদি মেশাচ্ছেন।

বাংলাদেশ স্টান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটি- উট (বিএসটিআই) ও কনজিওমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশে (ক্যাব) অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে আসে।

ভেজাল মসলা কিনে ক্রেতারা শুধু প্রতারিতই হচ্ছেন না, এতে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। কারণ ভেজাল মসলায় মেশানো ক্ষতিকর খাদ্যদ্রব্য ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভেজাল মসলা উৎপাদনকারী গুঁড়া মরিচের সঙ্গে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী মেশাচ্ছেন ইটের গুঁড়া। হলুদে দেয়া হচ্ছে মটর ডাল, ধনিয়ায় সমিলের কাঠের গুঁড়া ও পোস্তদানায় ব্যবহৃত হচ্ছে সুজি।

মসলার রঙ আকর্ষণীয় করতে বিশেষ ধরনের কেমিক্যাল রঙ মেশানো হচ্ছে।

এর কারণে গুঁড়া মরিচের ঝাল বাড়ে এবং হলুদের রং আরও গাঢ় হয়। মসলার ওজন বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে ধানের ভুসি। অসাধু চক্র প্রথমে গোপন কারখানায় ভেজাল মসলা উৎপাদন করে।

পরে তা প্যাকেটজাত করে খোলাবাজারে সরবরাহ করে। তারা কিছু প্যাকেট ছাড়া, কিছু সাধারণ প্যাকেটে এবং কিছু নামিদামি কোম্পানির লেভেল লাগিয়ে মসলাগুলো বিক্রি করেন।

ফলে ছয় দফা কেমিক্যাল বাজারের কলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা থেকে শুরু করে আপেল, আঙুর, নাশপাতিসহ দেশি-বিদেশি প্রায় সব ফলেই মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল।

সাধারণ ফল-মূলের উজ্জ্বল রঙ ক্রেতাদের নজর কাড়ে, সে গুলো বিক্রিও হয় বেশি দামে। তাই অপরিপক্ব ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং তা উজ্জ্বল বর্ণে রূপান্তর করার জন্য অধিক ক্ষার জাতীয় টেক্সটাইল রঙ ব্যবহার হচ্ছে অবাধে।

ড. মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার*
*উপপরিচালক (কৃষি সম্প্রসারণ ও গ্রামীণ অর্থনীতি) জাতীয় কৃষি প্রশিক্ষণ একাডেমি, গাজীপুর; dhossain1960@yahoo.com

Similar Posts

  • বাচ্চাদের কোন টিকা কিসের জন্য দেওয়া হয়

    সঠিক সময়ে সঠিক টিকা দেয়ার মাধ্যমে বাচ্চাদের অনেক ঘাতক ব্যাধি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। অনেক সময় বাবা মার সীমিত জ্ঞান বিষয়টিকে আরও বেশি জটিল করে তোলে। সকল বাবা মার উচিত বাচ্চাদের টিকার ব্যাপারে খুব ভালো ভাবে জেনে রাখা যাতে করে সঠিক সময়ে সঠিক টিকা দেয়া সম্ভব হয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া বাঞ্ছনীয়। টিকা…

  • কোলেস্টে-রলের মাত্রা বেড়ে গেলে

    কারও রক্তে কোলেস্টে-রলের মাত্রা অস্বাভাবিক পর্যায়ে বেড়ে গেলে, তা আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক নিয়মে ও, লাইফ স্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাভাবিক মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারি। প্রাকৃতিক উপায়ে কোলেস্টে-রল কমানোর পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক, ক্ষতিকর ঔষধ খেয়ে আমরা নিজেদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করি বেশি। আমরা অনেক সময় অসুস্থ হয়ে থাকি স্বাস্থ্য সচেতন-তার অভাবে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ন্যূনতম…

  • প্লেগ রোগ কি

    প্লেগ রোগ একটি প্রচন্ড ছোঁয়াচে ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ যেটা মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্য পায়ী প্রাণীদের আক্রমণ করে। মধ্য যুগে ইউরোপে এক সময় এই ব্যাধির জন্য হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল। এই মড়ক কালো মৃত্যু নামে পরিচিত। বর্তমানে, মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে এক ভাবে মানুষের প্লেগ হতে থাকে, কিন্তু ইহা আফ্রিকা এবং এশিয়ার দূরবর্তী ভাগে সব থেকে…

  • জেনে নিন হেপাটাইটিস রোগের ৫টি লক্ষণ

    হেপাটাইটিস হলো লিভারের একটি প্রদাহ। দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে হেপাটাই- টিসের বিভিন্ন ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটায়। হেপাটাইটিসের ভাইরাস প্রাথমিক অবস্থায় শরীরে কোনো উপসর্গ প্রকাশ না করলেও ধীরে ধীরে মারাত্মক হয়ে ওঠে। যদিও এই রোগ ছোঁয়াচে নয়। হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্তের ফলে লিভারের কার্য ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। প্রতি বছর লিভারের এই…

  • মাংকি পক্স: অগ্রাহ্য করার মত একটি রোগ

    আপনি যদি এখনো করোনাভাইরাস মহা- মারির চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকেন, আপনার জন্য দুঃখিত, কিন্তু আরো একটি ভাইরাসও জেঁকে বসবার উপক্রম করছে।এবারেরটির নাম মাংকি পক্স এবং এরই মধ্যে পৃথিবীর ১২টি দেশে ৮০ জনের দেহে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে । যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপিয়ান দেশ, যুক্ত রাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। ঠিক কি ঘটছে? এটি নিয়ে…

  • কোলেস্টেরলের প্রয়োজনীয়তা

    প্রতি দিনের কার্য সম্পাদনের জন্য শরীরে যে পরিমাণ কোলেস্টেরল দরকার সেই পরিমাণ কোলেস্টেরল আমরা খাবার থেকে গ্রহণ করতে পারি না বলে শরীর নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিজেই কোলেস্টেরল সংশ্লেষণ করে থাকে। আমরা কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবার থেকে যদি বেশি পরিমাণ কোলেস্টেরল গ্রহণ করিতবে শরীর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য কম পরিমাণ কোলেস্টেরল তৈরি করবে।  ডিম, দুধ, বাটার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *