বাচ্চাদের কোন টিকা কিসের জন্য দেওয়া হয়

সঠিক সময়ে সঠিক টিকা দেয়ার মাধ্যমে বাচ্চাদের অনেক ঘাতক ব্যাধি থেকে রক্ষা করা সম্ভব। অনেক সময় বাবা মার সীমিত জ্ঞান বিষয়টিকে আরও বেশি জটিল করে তোলে। সকল বাবা মার উচিত বাচ্চাদের টিকার ব্যাপারে খুব ভালো ভাবে জেনে রাখা যাতে করে সঠিক সময়ে সঠিক টিকা দেয়া সম্ভব হয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজনে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া বাঞ্ছনীয়।

টিকা কি?

টিকা এক ধরণের প্রতিষেধক যা একটি শিশু জন্মের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে। কিছু কিছু টিকা বাচ্চার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে যা অনেক বাবা-মায়েরই অনেক সময় অজানা থাকে।

বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন প্রয়োজনীয় টিকাঃ

(১) হেপাটাইটিস-বি টিকা (হেপ বি):

সকল নবজাতকের হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ হওয়ার আগে হেপাটাইটিস-বি ভ্যাকসিন (হেপ বি) নেয়া উচিত। 

(২) পোলিও  টিকাঃ
পোলিও একটি মারাত্মক ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে মুক্তির এক মাত্র উপায় শিশুকে সঠিক সময়ে টিকা দেয়া। দুই ভাবে পোলিও টিকা দেয়া যেতে পারে। যথা- ও. পি. ভি. এবং আই. পি. ভি. । ও. পি. ভি. হল ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন যা মুখে খাওয়ানো হয়ে থাকে এবং আই. পি. ভি. হল ইনএক্টিভেটেড পোলিও ভ্যাকসিন যা ইনজেকসান এর মাধ্যমে দেওয়া হয়।

(৩) বিসিজি টিকাঃ

বিসিজি টিকা হলো যক্ষ্মার প্রতিষেধক। শিশুর জন্মের ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই টিকা দিতে হয়। বিসিজি টিকা দিলে মরণ ব্যাধি যক্ষ্মা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই টিকার শুধু মাত্র একটি ডোজ। বাম হাতের কাধের কাছের হাতের অংশের চামড়ার নিচে এটি দেওয়া হয় । মাঝে মাঝে হালকা ক্ষত বাম লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মত কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।

(৪) ডিপিটি টিকাঃ

ডি তে ডিপথেরিয়া, পি তে পারটোসিস বা হুপিং কাশি ও টি তে টিটেনাস। তিনটি মারাত্নক ঝুঁকিপূর্ণ রোগের নাম। ডিপিটি টিকাটি এই তিনটি রোগের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। তাই শিশুর জন্য এই টিকা খুব গুরুত্ব পূর্ণ ।পারটুসিস টিকা দেয়ার সময় অনেকে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। যাদের এ প্রবণতা বেশি বা শরীর দুর্বল তাদের শুধু ডিপথেরিয়া ও টিটেনাসের টিকা দেয়া হয়। টিটেনাস বা ধনুষ্টাঙ্কারের টিকা শিশুদের জন্য খুবই জরুরী।

(৫) হামের টিকাঃ

হামের টিকা শিশুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি টিকা। হাম একটি খুব মারাত্নক কষ্টদায়ক একটি রোগ। এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য শিশুদের অবশ্যই হামের টিকা দেয়া উচিত। শিশুর ১৫ মাস বয়সে এ টিকা দিতে হয়।

(৬) টাইফয়েড টিকাঃ

টাইফয়েড একটি মারাত্নক ঘাতক ব্যাধি যা শিশুর যে কোনো অঙ্গ বিকল করে দিতে পারে এবং শিশু হারিয়ে ফেলতে পারে তার স্বাভাবিক কর্ম ক্ষমতা। এই রোগ জীবন পর্যন্ত নিয়ে নিতে পারে। তাই সময়মত শিশুদের টাইফয়েড এর টিকা দিতে হয়। দুই বছর বয়সের পর শিশুদের এই টিকাটি তিন বছর পর পর দিতে হয়।

(৭) রোটাভাইরাস টিকাঃ

ডায়রিয়া বাচ্চাদের জন্য একটি হুমকি স্বরূপ। বাংলাদেশের বেশির ভাগ বাচ্চা ছোট বয়সে ডায়রিয়াতে ভোগে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক পরিচর্যা করা হলে ডায়রিয়া থেকে বাচ্চা সুস্থ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু রোটা ভাইরাস জনিত ডায়রিয়া প্রাণ ঘাতক হতে পারে। তাই ডায়রিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে বাচ্চাদের রোটা ভাইরাস এর প্রতিষেধক রোটা ভাইরাস ভ্যাকসিন বা আরভি দিতে হবে। ডায়রিয়ার প্রতিষেধকের টিকা তিনটি ডোজে নিতে হয়। প্রথম ডোজ ৬ থেকে ১২ সপ্তাহের বয়সের মধ্যে দিতে হবে। পরবর্তী ডোজ  ১০ সপ্তাহ/৪মাসের মাঝে দিতে হবে।

(৮) নিউমোক্কাল ভ্যাকসিনঃ

বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে নিউমোনিয়া বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেক- শনকে শিশু মৃত্যু হারের অন্যতম কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী ভাইরাস হল নিউমোকক্কাস (স্ট্রেপটো- কক্কাস নিউমোনি) ও হেমোফাইলাস ইনইয়ু- যেকি। এই দুই ভাইরাস এর প্রতিষেধক হিসেবে এই টিকার কোন বিকল্প নেই। এর জন্য সিজনাল অ্যান্টি ভাইরাল ভ্যাকসিন বা নিউমোক্কাল ভ্যাকসিন যে কোনটি দিলেই হয়। সাধারনতঃ অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশু- দের এই টিকা দিতে হয়। নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন দিলে ফুস ফুসের সংক্রমণ কম হয় এবং ঝুঁকি কম থাকে ।

(৯) ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনঃ

ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ছোঁয়াচে ব্যাধি । এই ভাইরাস প্রধানতঃ মানুষের শ্বসন তন্ত্রকে আক্রমণ করে, ফলে রোগীর হাঁচি, কাশি ও নির্গত মিউকাসের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগ সুস্থ মানুষের দেহে সংক্রমিত হয় । এই রোগে প্রথমে অনবরত হাঁচি হয় ও নাক দিয়ে জল পড়ে, পরে প্রচন্ড গা, হাত, পা বেদনা সহ তীব্র জ্বর হয় । তাই  বাচ্চাদের এই রোগের টিকা দেয়া অত্যন্ত জরুরী। এই রোগের জন্য সাধারণতঃ দুই ধরনের টিকা আছে- টিআইবি ও এএআইভি । এর মধ্যে টিআইবি ছয় মাস বয়সে এবং এএআইভি দুই বছর বয়সের পর দিতে হয়।

(১০) চিকেন পক্স টিকাঃ
চিকেন পক্স বা জল বসন্ত একটি ভাইরাস সংক্রমক রোগ । জন্মের ৫ দিনের মাঝে এই রোগ হলে মারাত্মক ভাইরেমিয়া-এ জনিত কারণে বাচ্চার মৃত্যুও হতে পারে। জল বসন্ত প্রতিরোধ করতে শিশুর জন্মের ১২ মাস পরে এবং ৪-১২ বছরের মাঝে দুই ডোজে টিকা দিতে হয়।

(১১) এম এম আর টিকাঃ
এম এম আর মূলত মাম্পস, মিজলস এবং রুবেলা রোগের টিকা। এই রোগ গুলোর টিকা প্রধানতঃ ৪ থেকে ৬ বছরের মাঝেই দিয়ে দিতে হয়।

পরিশিষ্টঃ

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে অনেক কঠিন কঠিন রোগের টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে এবং হচ্ছে । কিন্তু পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে আমরা সেই সব রোগের প্রতিষেধ- কের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছি না।
অনেক সময় বাবা মায়েরা সন্তানকে টিকা দেয়া থেকে বিরত থাকতে চায় বিভিন্ন ধরণের কুসংস্কারের কারণে। আবার খুব অল্প বয়সে অনেকে শিশুদের ঔষধ বা ইনজেকশন দিতে চান না। কিন্তু এই ধরণের ভ্রান্ত ধারনা শিশুর জীবনে মারাত্নক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। সঠিক সময় সঠিক টিকা প্রদানের মাধ্যমে শিশুরা অনেক ধরণের মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে পারে।

Similar Posts

  • থাইরয়েড

    থাইরয়েড হল একটি প্রজাপতির আকৃতির গ্রন্থি, যা ঘাড়ের শ্বাস নালীর (বায়ু প্রবাহ) সামনে থাকে। থাইরয়েডের কাজ হল হরমোন সিক্রেট করা যা, শরীরের কাজকে পরিবর্তন করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। থাইরক্সিন (T4) এবং Triiodothyronine (T3) হল থাইরয়েড হরমোন। এই হরমোন গুলি থাইরয়েড গ্রন্থি দ্বারাসরা সরি, রক্তে সিক্রেটেড হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ভ্রমণ করে। এই হরমোন গুলি…

  • লিভার ফেইলিউর রোধে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণ জরুরিঃ লিভার ফেইলিউরের ভয়াবহতা, চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে লিভারের কার্য- ক্ষমতা যখন কমে যায় অথবাশরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী যখনই ইহা কাজ করতে পারে না তখনই ইহাকে লিভার ফেইলিউর বলা হয়।  একে তিন ভাগে ভাগ করা যায়ঃ এক) আকস্মিক ফেইলিউর,  দুই) দীর্ঘমেয়াদি ফেইলিউর,  তিন) দীর্ঘমেয়াদি আকস্মিক ফেইলিউর। আর…

  • ইউরিক এসিড কি, কেনো হয়, করণীয়

    উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিডের কারণে গেঁটে বাত বা গিরায় গিরায় ব্যথা, উচ্চ রক্ত চাপ, কিডনি অকেজো হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতি দিনের খাবারের মধ্যে কিছু আছে যে গুলোতে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি।  আবার কিছু পুষ্টিকর খাবার আছে যেগুলো ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে, ঔষধের মত কাজ করে। বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা আমিষ খেলে অথবা…

  • কোলেস্টে-রলের মাত্রা বেড়ে গেলে

    কারও রক্তে কোলেস্টে-রলের মাত্রা অস্বাভাবিক পর্যায়ে বেড়ে গেলে তা আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাকৃতিক নিয়মে ওলাইফ স্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাভাবিক মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারি।  প্রাকৃতিক উপায়ে কোলেস্টে-রল কমানোর পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেকক্ষতিকর ঔষধ খেয়ে আমরা নিজেদের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করি বেশি। আমরা অনেক সময় অসুস্থ হয়ে থাকি স্বাস্থ্য সচেতন-তার অভাবে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ন্যূনতম যে সাধারণ জ্ঞান…

  • থাইর-য়েড ক্যান্সার কোন বয়সের  লোকদের বেশি ঝুঁকি থাকে

    থাইর-য়েড ক্যান্সার মূলত দুই ধরণের হয়ে থাকে।  এক অল্প বয়সে হতে পারে আবার শেষ বয়সেও হতে পারে।  বয়স্ক অবস্থায় থাইর-য়েড আক্রান্ত হলে-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়। বেশি বয়সের রোগীদের সঙ্গে সঙ্গে  সতর্কতার সাথেঅস্ত্র পাচার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসক গণ।  থাইরয়েড আক্রান্ত ব্যক্তিকে কি কি পরীক্ষা করে থাকেন? রোগীকে সম্পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য এফটি থ্রি, এফপি ফোর,…

  • পোলিও রোগ বা পোলিওমাইলাইটিস কি

    পোলিও রোগ বা পোলিও মাইলাইটিস, সাধারণতঃ পোলিও নামে পরিচিত, একটি নিউরো-মাস্কুলার ডিজেনারেটিভ অর্থাৎ স্নায়ু পেশীর অপক্ষয় রোগ। এই রোগের কারণ হল পিকর্নাভাইরাইডে পরিবারের একটি ভাইরাস । এই ভাইরাস মেরুদণ্ড এবং ব্রেনস্টেমের অ্যানটেরিয়র হর্ন মোটর নিউ- রনকে আক্রমণ করে; এই মোটর নিউরন আর সেরে ওঠে না এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কঙ্কাল পেশীর গঠন বিকৃত ভাবে হয়।ইহা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *