শারীরিক সুস্থতায় ব্যায়ামের ভূমিকা
শারীরিক ব্যায়াম(Physical exercise) হল যে কোন শারীরিক কার্যক্রম যা শারীরিক সুস্থতা রক্ষা বা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
এর অপর একটি অর্থ হল নিয়মিত আন্দোলন শরীরের বিভিন্ন স্থানে । বিভিন্ন কারণে ব্যায়াম করা হয়, যেমন- মাংসপেশী ও সংবহন তন্ত্র সবল করা, ক্রীড়া-নৈপুন্য বৃদ্ধি করা, শারীরিক ওজন হ্রাস করা বা রক্ষা করা কিংবা শুধু উপভোগ করা।
নিয়মিত ব্যায়াম মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হতে পুন রুদ্ধার হতে সাহায্য করে।
হৃদ্ররোগ, সংবহন তন্ত্রের জটিলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা রোধে শারীরিক ব্যায়াম কার্যকর ভূমিকা রাখে।
এছাড়া মানসিক অবসাদ গ্রস্ততা দূর করতে, ইতি বাচক আত্ম সম্মান বৃদ্ধিতে, সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায়, ব্যক্তির যৌন আবেদন বৃদ্ধি, শরীরের সঠিক অনুপাত অর্জনে শারীরিক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিশু স্বাস্থ্যের স্থূলতা একটি সম কালীন বিশ্ব ব্যাপী সমস্যা। ব্যায়াম শরীরের স্থূলতা রোধে কাজ করে। স্বাস্থ্য সেবা প্রদান কারীরা শারীরিক ব্যায়ামকে “অলৌকিক” এবং “আশ্চর্য জনক” ঔষধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ।
শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা
রক্ষার্থে ব্যায়ামের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রমাণিত ।
মানব শরীরের উপর প্রভাবের ভিত্তিতে শারীরিক ব্যায়ামকে তিনটি গ্রুপে ভাগ
করা হয়ঃ
অ্যারোবিক ব্যায়ামঃ
যেসব ব্যায়াম বা শারীরিক কার্যক্রম শরীরের বড় মাংশ পেশীগুলো ব্যবহার করে শরীরের অক্সিজেন গ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি করে সেগুলো অ্যারোবিক ব্যায়াম।
এসব ব্যায়ামের লক্ষ্য শরীরের হৃদপিন্ড সহ সামগ্রিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সহন শীলতা বৃদ্ধি করা। এ ধরনের ব্যায়ামের উদাহরণ হল সাইক্লিং, সাতার, হাইকিং, টেনিস, ফুটবল ইত্যাদি খেলা ।
অ্যানেরোবিক ব্যায়ামঃ
এ সমস্ত ব্যায়াম শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং মাংস পেশী ও হাড়ের সবলতা বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া শরীরের ভারসাম্য বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে।
এ ধরনের ব্যায়ামের উদাহরণ হল পুশ আপ, বাইসেপ কার্লস, পুল আপ ইত্যাদি। ভারোত্তলন, ফাংশনাল প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ও এজাতীয় ব্যায়ামের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
ফ্লেক্সিবিলিটি ব্যায়ামঃ
এসব ব্যায়াম শরীরের মাংশ পেশীর প্রসারণ ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এ ধরনের ব্যায়ামের লক্ষ্য শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা যাতে ইনজুরি বা আঘাতের প্রবণতা হ্রাস পায়।
শারীরিক সুস্থতা বজায় ও শরীরের ওজনের ভার সাম্য রাখার ক্ষেত্রে ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম ।
এছাড়া শরীরের হাড়ের দৃঢ়তা বজায় রাখা, মাংস পেশীর সবলতা এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সমূহের স্বাভাবিক চলন ক্ষমতা বজায় রাখতে ব্যায়াম উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রাখে।
শরীর ও মনস্তত্ত্বের সার্বিক সুস্থ্যতা বজায়, অস্ত্র প্রচারকালীন ঝুকি হ্রাস,রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যায়ামের ইতি বাচক ভূমিকা প্রমাণিত হয়েছে ।
ব্যায়াম করার সময় শরীরের বিভিন্ন মাংস পেশীর সংকোচন ঘটে, এসময় মাইয়োকিন নামের এক জাতীয় রাসায়নিক প্রদার্থ শরীরে নিঃসৃত হয় যা নতুন টিস্যুর উৎপাদনে, টিস্যুর মেরামত এবং প্রদাহী রোগ সমূহের ঝুঁকি হ্রাসের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে ।
শারীরিক ব্যায়াম শরীরে করটিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, করটিসল বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার জন্য দায়ী ।
ব্যায়াম থুতুতে নাইট্রাইটের মাত্রা বৃদ্ধি করে, এটি নাইট্রিক অক্সাইডে পরিবর্তিত হয় ফলে শরীরের কাজ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ।
অ্যাথলেটদের থুতুতে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা দ্বারা তাদের প্রশিক্ষণের অবস্থা নির্ণয় করা হয় । খাওয়ার আগে সহন শীলতা বৃদ্ধিকারী ব্যায়াম সমূহ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শারীরিক ব্যায়ামের অভাব হৃদরোগের প্রবণতা ১৭% বৃদ্ধি করে, বার্ধক্য অর্জন ত্বরাণ্বিত করে এবং স্তন ক্যান্সার ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি ১০% বৃদ্ধি করে ।
সবাত ও অবাত, দুই ধরনের ব্যায়ামই হৃদ যন্ত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ব্যায়ামের কারণে হৃদ যন্ত্রের প্রাচীরের পুরুত্ব বৃদ্ধি পায়, যা শরীরের জন্য উপকারী।
ব্যায়ামের কারণে সব মানুষ সমান উপকৃত হয় না । তবে স্বাভাবিক ভাবে প্রায় সবারই ব্যায়ামের কারণে শারীরিক সহন শীলতা
বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে সবাত ব্যায়ামের ফলে।
এর ফলে অক্সিজেন গ্রহণের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। এসমস্ত উপকারের সাথে সঠিক পুষ্টি গ্রহণও সম্পর্কিত ।
ব্যায়ামের কারণে শরীরের সার্বিক অবস্থার উন্নতি মানুষ ভেদে বিভিন্ন । এটা অ্যাথলেটদের সাথে সাধারণ মানুষদের অন্যতম বড় শারীর বৃত্তীয় পার্থক্য।
গবেষণায় দেখা গেছে মধ্য বয়সে নিয়মিত ব্যায়ামের কারণে পরবর্তিতে শারীরিক কার্য ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
কেন ব্যায়াম করতেই হবেঃ
স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য চাই নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম । শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে ও শরীরের ওজনের ভার সাম্য ঠিক রাখতে ব্যায়াম গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়াও শরীরের হাড়ের দৃঢ়তা বজায় রাখা, মাংস পেশীর সবলতা এবং অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ সমূহের স্বাভাবিক চলন ক্ষমতা বজায় রাখতে ব্যায়ামের কোন বিকল্প
নেই ।
যদি ব্যায়াম না করা হয় তাহলে ধীরে ধীরে পেশী গুলো দুর্বল হয়ে পড়বে এবং শরীরে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে ।
ব্যায়াম কেন এতো গুরুত্বপূর্ণঃ
শরীরকে স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম রাখার ক্ষেত্রে, শরীরচর্চা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
নিয়মিত শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে হলে শরীর চৰ্চার বিকল্প নেই। যদি আগে থেকে শরীর চর্চা করার অভ্যাস না থাকে, তাহলে ধীর গতিতে শুরু করুন।
প্রথম দিকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাঁটুন । এভাবে ধীরে ধীরে সেই সময় বাড়িয়ে দিয়ে পর্যায়ক্রমে ৩০ মিনিটে বৃদ্ধি করুন। ব্যায়াম করার নিয়মাবলী না জেনে ব্যায়াম করলে, উপকারের থেকে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশী ।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন সপ্তাহ ২ থেকে ৩ বার। সেই সাথে প্রতিদিন ইয়োগা করুন। কিন্তু আপনি যতই শরীর চর্চা করুন না
কেন, আপনাকে অবশ্যই আপনার
শরীরের সক্ষমতা কেমন তা জেনে রাখা প্রয়োজন।
যদি কোন ধরণের শারীরিক সমস্যা থেকে থাকে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না কিন্তু।
ব্যায়াম চর্চাকে প্রতি দিনের অভ্যাসের তালিকায় সামিল করতে হলে নিম্নের আলোচিত ব্যায়াম করার নিয়মাবলী অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
ব্যায়াম শুরু করার পূর্ব করণীয়ঃ
সঠিক সময় নির্ধারণ করুন।
ডিলে ডালা জামা কাপড় পরে ব্যায়াম করুন।
প্রথমে ওয়ার্ম আপ তথা ফ্রি হ্যান্ড করে তার পর ভারী ব্যায়াম করা উচিত।
খাবারের ২ ঘন্টা পর ব্যায়াম করতে হবে । আর, ব্যায়াম করলে, ভাল ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।
একেক জনের ব্যায়ামের নিয়ম একেক রকম হতে পারে, বিশেষ করে ভারী ব্যায়াম গুলোর ক্ষেত্রে ।
সেক্ষেত্রে জিম ট্রেইনার বা চিকিৎসকের পরমার্শ নেয়া উচিত। ব্যায়াম করার সময় শরীর খারাপ লাগলে ব্যায়াম করা বন্ধ রাখুন।
ব্যায়াম চর্চার জন্য রুটিন অনুসরণ করুন।
আপনার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে, একটি রুটিন তৈরি করে রাখুন। যদি আগে কখনোই ব্যায়াম চর্চা করে না থাকেন অবশ্যই ধীর গতিতে শুরু করুন।
যখনই ধীরে ধীরে ব্যায়াম চর্চা অভিজ্ঞ হবেন,সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যায়ামের পরিমান বাড়িয়ে দিয়ে, রুটিনে অন্তর্ভূক্ত করে নিতে হবে ।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, প্রথম দিকে ১০-১৫ মিনিট হাঁটুন । এভাবে ধীরে ধীরে ১ থেকে ২ সপ্তাহ হাঁটার পর, ৩০ মিনিট সময় হাঁটার জন্য নতুন করে বরাদ্ধ করুন।
অবশ্যই কতটুক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন
তা মাথায় রাখুন। পরবর্তীতে হাঁটার গতিকে বাড়িয়ে দিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে ১ থেকে ১.৫ কিলোমিটার হাঁটুন। এভাবে ধীরে ধীরে ৩০ মিনিটে ৩ কিলোমিটার হাঁটার চেষ্টা করুন।
সাইক্লিংঃ
বাইক রাইডে ঘুরে আসুন। যদি এক্সার সাইজ করার ভিন্ন কোন পদ্ধতি খুঁজে থাকেন, ঘুরে আসতে পারেন সাইক্লিং
করে । মাঝে মাঝে সাইক্লিনিং সবচেয়ে
বড় একটি এক্সার সাইজ হয়ে থাকে
উপসংহারঃ
এই ছিল ব্যায়াম করার নিয়মাবলী নিয়ে সংক্ষিপ্ত লেখা । এখানে, বেশির ভাগ জন প্রিয় ব্যায়ম সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।