স্ট্রোক কী ধরনের অসুখ
স্ট্রোক মস্তিষ্কের একটি রোগ, যাতে রক্তনালির জটিলতার কারণে হঠাৎ করে,
মস্তিষ্কের একাংশ কার্য কারিতা হারায়। মনে রাখতে হবে, স্ট্রোক হার্টের কোনো রোগ নয়।
স্ট্রোকের লক্ষণঃ
০১) হঠাৎ করে শরীরের একাংশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া।
০২) মাথাব্যথা ও বমি হওয়া।
০৩) হঠাৎ অজ্ঞান হওয়া।
০৪) কথা জড়িয়ে যাওয়া বা একে বারেই কথা বলতে না পারা।
স্ট্রোক হলে তাৎক্ষণিক কী করণীয়?
ওপরের লক্ষণ গুলো দেখা দিলে বুঝতে হবে তাঁর স্ট্রোক হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে আতঙ্কিত না হয়ে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজনে কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিতে হবে।
সম্ভব হলে মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান করে স্ট্রোকের ধরন বুঝতে হবে।
মনে রাখতে হবে, স্ট্রোক দুই ধরনের হয়। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার জন্য,
অথবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের জন্য এবং যার চিকিৎসা পদ্ধতিও ভিন্নতর।
জরুরি চিকিৎসা (অজ্ঞান রোগীর ক্ষেত্রে):
০১) শ্বাস নালি, শ্বাস প্রশ্বাস ও রক্ত সঞ্চালন নিয়মিত রাখা।
০২) রোগীকে এক দিকে কাত করে, বালিশ ছাড়া মাথা নিচু করে শোয়াতে হবে।
০৩) চোখের যত্ন নিতে হবে।
০৪) মূত্র থলির যত্ন (প্রয়োজনে ক্যাথেটার দিতে হবে)।
০৫) খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
স্ট্রোকের সব রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না।
তবে মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরণ, খিঁচুনি, রোগী অজ্ঞান হলে বা স্ট্রোকের সঙ্গে,
অন্যান্য রোগ (যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়া বেটিস ইত্যাদি) থাকলে,
হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন। চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো,
কর্ম ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং পরবর্তী সময়ে যেন স্ট্রোক না হয়, তার ব্যবস্থা করা।
প্যারালাই সিস হলে বা মুখ বেঁকে গেলে কী করা যায়?
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা ও ফিজিও থেরাপি নিতে হবে।
বাংলাদেশে স্ট্রোকের হার প্রতি হাজারে ৫-১২। আর প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে আছে।
স্ট্রোক প্রতি রোধের উপায়ঃ
স্ট্রোক অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য। স্ট্রোক প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা।
যেমন: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান পরিহার করা,
রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক ব্যায়াম নিয়মিত করা, ওজন ঠিক রাখা,
প্রতি দিন পর্যাপ্ত পরিমাণ শাক সবজি ও সতেজ ফল মূল খাওয়া।
চিকিৎসা করলে ৩০ শতাংশ সম্পূর্ণ রূপে সুস্থ হয়,
আর ৩০ শতাংশ পক্ষাঘাত গ্রস্ত হয়ে থাকে। সাধারণতঃ,
চল্লিশোর্ধ্ব মানুষের স্ট্রোক বেশি হয়। তবে কম বয়সেও স্ট্রোক হতে পারে।
স্ট্রোকের বিভিন্ন কারণঃ
০১) ডায়াবেটিস।
০২) উচ্চ রক্ত চাপ।
০৩) রক্তে অতিরিক্ত চর্বি/কোলেস্টে-রল
০৪) ধূমপান এ ছাড়া বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটির কারণেও স্ট্রোক হতে পারে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়,
বেশি বা মাঝারি মাত্রার মদ্যপানে বাড়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি।
কী করে বুঝবেন স্ট্রোক করেছে
স্ট্রোক প্রতিরোধে, যেমন সচেতনতা প্রয়োজন, তেমনি স্ট্রোকের উপসর্গ গুলো,
জানা থাকাও বাঞ্ছনীয়। রোগীর জীবন বাঁচাতে দ্রুত তম সময়ে,
স্ট্রোকের উপসর্গ শনাক্ত করে আধুনিক-তম চিকিৎসা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
এমন চিকিৎসা নেওয়া গেলে স্ট্রোক–পরবর্তী জীবনটাও হয় সহজ।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে
স্ট্রোকের সবচেয়ে পরিচিত উপসর্গ হলো শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে পড়া,
কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া। এর বাইরে,
নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। খিঁচুনি, বমি, শরীরের ভারসাম্য হীনতা,
হঠাৎ তীব্র মাথা ব্যথা, মুখের পেশির দুর্বলতা বা অবশ ভাব, কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া,
জ্ঞানের মাত্রা কমে যাওয়া, হঠাৎ এক বা দুই চোখের দৃষ্টি,
চলে যাওয়া কিংবা একটি জিনিসকে দুটি দেখা।
করণীয়:
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে এমন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে,
যেখানে স্ট্রোক ইউনিট রয়েছে। রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়ে,
যে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে, তা গলিয়ে ফেলার জন্য আছে,
থ্রম্বো-লাই-সিস নামক চিকিৎসা। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
দেরি হয়ে গেলে আর এই চিকিৎসা করে লাভ নেই।
রক্ত ক্ষরণ জনিত স্ট্রোকও অস্ত্রো পচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করা সম্ভব।
তাই রোগীকে যত দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যায় তত ভালো।
প্রতিরোধে সচেতনতা:
স্ট্রোক হওয়ার পর মস্তিষ্কের যেটুকু ক্ষতি হয় তা প্রায় অপূরণীয়।
তাই সব চেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ হলো স্ট্রোক প্রতিরোধে সচেতনতা।
প্রতিরোধ যোগ্য এই রোগ বিষয়ে সবাইকেই সচেতন হতে হবে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
তেল-চর্বি এবং শর্করা জাতীয় খাবার কম খেতে হবে।
‘ভেতো বাঙালি’র তকমা ছাড়িয়ে ফেলুন আজই। ভাতের পরিমাণ কমিয়ে দিন।
ভাতের থালা পূর্ণ করুন শাক ও সবজি দিয়ে।
সঙ্গে রাখুন প্রয়োজনীয় আমিষ। চিনি বা লবণ দেওয়া পানীয় বর্জন করুন।
শরীর চর্চার বিকল্প নেই। হাঁটুন, গন্তব্যের কিছু আগেই বাহন থেকে নেমে পড়ুন,
বাকি পথটা হেঁটেই পৌঁছান। জগিং বা দৌড়ানো, সাঁতার, দড়ি লাফ,
সাইকেল চালানো—যে কোনো ব্যায়ামই করতে পারেন।
শরীরটাকে সচল রাখুন। শুয়ে-বসে অলস সময় কাটাবেন না।
ছুটির দিন গুলোতে বাড়ির শিশুদের সঙ্গে ঘরের বাইরে খেলা ধুলা করতে পারেন।
বন্ধুরা মিলে ক্রিকেট, ফুটবল বা এমন কোনো খেলা খেলতে পারেন,
যাতে শারীরিক পরিশ্রম হয়। কর্ম স্থল থেকে অবসরে গেলেও সচল থাকুন।
ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও রক্তের কোলেস্টে-রল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
যে কোনো দীর্ঘ মেয়াদি রোগে ভুগলে অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকুন।
কোনো রোগীকে রক্ত পাতলা করার কোনো ঔষধ,
দেওয়া হলে (যেমন অ্যাস-পিরিন, এনোক্সা-পারিন প্রভৃতি) কিংবা,
কিডনি রোগীদের ডায়ালাই-সিসের সময় হেপারিন ব্যবহার করলে,
চিকিৎসক কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখেন, এ জন্য কিছু পরীক্ষাও করাতে দিতে পারেন।
এ গুলো নির্ধারিত সময়ে করিয়ে ফেলতে হবে।
জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল বা হরমোন সমৃদ্ধ অন্য কোনো জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি,
স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ধরনের কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করতে চাইলে,
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
মেনো-পজের পর হরমোন থেরাপি নিতে হলেও তাই চিকিৎসকের পরামর্শে থাকুন।