হেপাটাইটিস বি

হেপাটাইটিস–বি ভাইরাস জনিত জন্ডিস (Hepatitis B Virus Jaundice)
সাধারণতঃ যৌন সঙ্গমের মাধ্যমে হেপাটাইটিস–বি ভাইরাস দ্বারা এ রোগটি হয় ।

প্রধানতঃ যকৃতের ওপর এর ক্ষতিকারক দিকটি সব চেয়ে বেশি। ফলে জন্ডিস দেখা দেয়। রোগের সুপ্তিকাল ৬ সপ্তাহ থেকে ৬ মাস। বেশির ভাগ রোগীই আপনা-আপনি ভাল হয়ে যায়।

তবে ৫-১৫% রোগী ভালো হয় না। এবং এদের শরীরে ভাইরাসটি থেকে যায় এবং রোগ ছড়াতে পারে। অনেক দিন রোগে ভোগার পর রোগীর লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সারের মত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

সাধারণতঃ হেপাটাইটিস–বি ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর রক্ত, মুখের লালা, যোনিরস এবং বীর্যে এই ভাইরাস থাকে । রোগের সুপ্তিকাল অর্থাৎ জন্ডিস দেখা দেবার ১ মাস পূর্ব থেকে রোগ থাকাকালীন সময়ে এ রোগটি ছড়ায়। রোগ ভালো হয়ে গেলেও ৫-১৫% রোগীর কাছ থেকে এ ভাইরাসটি দীঘ দিন যাবত ছড়াতে পারে ।

হেপাটাইটিস –বি কিভাবে ছড়ায় ?

রক্তের মাধ্যমে ;

সংক্রমিত সিরিঞ্জ এবং সূচের মাধ্যমে।

মায়ের শরীর থেকে নবজাতকের রক্তে বা শরীরে ;

যৌন মিলনের মাধ্যমে।

রোগের লক্ষণঃ

অন্যান্য ভাইরাল হেপাটাইটিসের লক্ষণের মত হেপাটাইটিস –বি ভাইরাসের লক্ষণ হয়ে থাকে। যেমন: জন্ডিস, দুর্বল লাগা, পেটে ব্যথা করা, খাবার হজম না হওয়া, রুচির অভাব ইত্যাদি।

এ সময় যকৃত বড় হয়ে যায়, ফুলে যায়, ব্যথা করে। প্রস্রাব হলুদ রং এর হয়। গায়ের চামড়া এবং চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায়।

প্রতিরোধঃ

হেপাটাসইটিস –বি টিকা দিয়ে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

রক্ত গ্রহণ করার পূর্বে পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন হেপাটাইটিস –বি ভাইরাস আছে কিনা।

রক্ত পরীক্ষা না করে রক্ত দেয়া এবং নেওয়া উচিত নয় ।

অনেক রোগ আছে যেটা আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে আসে। অনেক সময় রোগগুলি সহজেই যায় তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগীর জীবনের উপর সঙ্কট তৈরি হয়। বর্ষাকালে যেমন অনেক রোগ মাথা তোলে এবং তার মধ্যে একটি রোগ হল হেপাটাই- টিস বি। এই রোগটি ভাইরাস বি-এর কারণে হয়।

যকৃতের প্রদাহকে হেপাটাইটিস বলা হয়। যকৃতে প্রদাহ সৃষ্টি করে এমন একটি
বিপজ্জনক ভাইরাস হল বি। এই ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে যকৃতে যে রোগ হয় সেটা হেপাটাইটিস- বি হিসাবে পরিচিত । এই ভাইরাস- বি যকৃতকে অসুস্থ করে তোলে।

যদি এই ভাইরাসটি শরীরের মধ্যে উপস্থিত থাকে তবে যকৃত এবং এই ভাইরাসটির মধ্যে ক্রমাগত লড়াই চলতে থাকে। এই ভাইরাস- বি সর্বদাই যে বিপজ্জনক হবে এমন জরুরি নয় তবে কখনও কখনও এটি যকৃতের জন্য সংকটের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

টিকাঃ

যদি আপনি ভাইরাস- বি-এর দ্বারা আক্রান্ত না হয়ে থাকেন তবে সব সময় আপনার সজ্জিত রোগের ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হেপাটাইটিস -বি টিকা করন জরুরী। আর যদি আক্রান্ত হয়ে থাকেন তবে বুঝবেন যকৃতের উপর সঙ্কট চলে এসে এবং টিকা নেওয়া অনর্থক।

নিষ্ক্রিয় ভাইরাসঃ

যকৃত রক্তে তৈরি বিষাক্ত পদার্থ এবং শরীর থেকে ভাইরাস -বি অপসারণ করে। এবং যদি এটি ঘটতে না পারে তবে ভাইরাস- বি যকৃতকে আক্রমণ করতে প্রস্তুত থাকে। সংক্রমণের পরে, ভাইরাস -বি থেকে উদ্ধার করা যকৃতের উপর সব সময় নজর রাখতে হবে। হেপাটাইটিস -বি পজিটিভ হওয়ার পরেও, দুটি অবস্থার গঠন হয়।

ভাইরাস -বি নিষ্ক্রিয় পর্যায়ে থাকতে পারে। এই অবস্থায়, ভাইরাস যকৃত নষ্ট করে না। ভাইরাস শরীর ছেড়ে চলেও যেতে পারে, আবার সক্রিয়ও হয়ে উঠতে পারে। তাই হেপাটাইটিস -বি ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় থাকলেও নিয়মিত এটার চিকিৎসকদের দ্বারা পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া উচিত।

সক্রিয় ভাইরাসঃ

দ্বিতীয় শর্তটি হল যে, ভাইরাসটি শরীরের সক্রিয় অবস্থানে রয়েছে, ইহা বিপজ্জনক এবং ইহার ঔষধের সাথে সঠিক চিকিৎসা করার প্রয়োজন। সক্রিয় হেপাটাইটিস ভাইরাসের পুরনো সংক্রমণ থাকলে তার পরে যকৃতে সিরোসিস এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। শরীরের মধ্যে এই ভাইরাসটি থাকলেও বছরে এক বার পরীক্ষা করে নেওয়া দরকার যাতে ইহা জানা যায় যে, ভাইরাসটি কি স্থিতিতে আছে।

পরিসংখ্যানঃ

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সর্ব শেষ পরিসংখ্যান অনুসারে বিশ্ব ব্যাপী ২ বিলিয়ন মানুষ এই ভাইরাস দ্বারা প্রভাবিত হয়। প্রতি বছর ৬ লাখ মানুষ মারা যায় এই রোগে আক্রান্ত হয়ে।

ভারতে হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। হেপাটাইটিস বি এইচ আইভি রোগের থেকে ১০০ গুণে- রও বেশি সংক্রামক।

ভাইরাস বি সংক্রমণের লক্ষণঃ

হেপাটাইটিস বি সংক্রামিত হওয়ার পরে সাধারণতঃ কোন লক্ষণ দেখা দেয় না। হেপাটাইটিস- বি এর প্রাথমিক লক্ষণগুলি হল-

ক্ষুধার অভাব ;

ক্লান্তি অনুভব ;

হালকা জ্বর ;

পেশী এবং জোড়গুলোতে ব্যথা ;

বমি বমি ভাব এবং বমি করা ;

ত্বকের হলুদ হয়ে যাওয়া ;

প্রস্রাবের রং কালো হয়ে যাওয়া ;

যদি আপনার শরীর এই সংক্রমণের সঙ্গে যুদ্ধে সফল হয়ে যায় তাহলে এই লক্ষণ গুলিও অদৃশ্য হয়ে যাবে। যারা এই সংক্রমণ থেকে মুক্ত হয় না, তাদের সংক্রমণকে ক্রনিক বলা হয়।

এই ধরনের লোকের উপসর্গ গুলিতে সামনে আসে না এবং ইহা সম্ভব যে, তারা জানেও না তাদের শরীরে এই ভাইরাসটি যে উপস্থিত আছে। লম্বা সময়ের পরে তারা জানতে পারে এটা যখন তাদের যকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে এবং সিরাসোসিসের অবস্থা ছুঁয়েছে।

সংক্রমণের কারণঃ

হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের কারণগুলো এইচআইভির সাথে প্রায় একই ।

রক্তের সম্পর্কে আসা ;

অরক্ষিত যৌন সংগম ;

একটি অসুস্থ রোগীর রক্ত চড়ানও
সংক্রামিত সুই, ড্রাগস নেওয়ার অভ্যাস ;

দীর্ঘ মেয়াদী কিডনি ডায়ালিসিস ;

শরীরের উপর উল্কি বা আকুপাংচারের সূচ ;

মায়ের থেকে সংক্রামিত।

উদ্ধার ব্যবস্থাঃ

সম্পূর্ণ রূপে সংক্রমণ এড়াতে, প্রথমে স্ক্রীনিং অপরিহার্য । একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা থেকেই ইহা জানতে পারেন যে এই সংক্রমণ থেকে মুক্ত কিনা তাহলে কোনও দেরী না করে টিকা নিন। আপনার পাশাপাশি পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকেও টিকা নেওয়ান।

সংক্রমণ চিকিৎসা কি?

হেপাটাইটিস- বি সংক্রমিত পুরনো রোগী- দের চিকিৎসার ভাইরাল প্রতিরোধী ঔষধ দিয়ে হয়। এই ঔষধ রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ হ্রাস করতে বা সেগুলি সরিয়ে দিতে পারে যার ফলে যকৃত সিরোসিস বা যকৃত ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

Similar Posts

  • বিউবনিক প্লেগ (ইংরেজি:  Bubonic plague) কি

    বিউবনিক প্লেগ (ইংরেজি: Bubonic plague) হল ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামক ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত প্লেগ রোগের তিনটি প্রকারের একটি। [১] জীবাণুর সংস্পর্শে আসার ১ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। [২] উপসর্গগুলো হল জ্বর, মাথাব্যথা, বমি। [৩] ত্বকের যে স্থান দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করে তার নিকটবর্তী লসিকা গ্রন্থি ফুলে যায় ও ব্যথা হয়। মাঝে মধ্যে ফোলা লসিকা গ্রন্থি ফেটে যেতে পারে। বিউবনিক প্লেগঃ বিউবনিক প্লেগ রোগে আক্রান্ত রোগীর…

  • কলেরা কি? কলেরার লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ। – What is Cholera

    Vibrio cholerae নামক ব্যাকটেরিয়া কোনো ভাবেই মুখ দিয়ে পরিপাক তন্ত্রের ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করলে সুস্থ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়। সুস্থ লোকের পেটে জীবাণু না যাওয়া পর্যন্ত এ রোগ হয় না। সুস্থ লোক আক্রান্ত লোকের মলের উপর দিয়ে হেঁটে গেলে বা আক্রান্ত রোগীর মল বা বমি শরীরে মেখে গেলেও এ রোগ হয় না। দূষিত খাবার, পানি, মাছি…

  • টেস্টো-স্টেরন এর ডায়েট চার্ট কেমন হওয়া উচিৎ

    টেস্টো-স্টরন হরমোন-এর ঘাটতি কমাতে কিংবা,  টেস্টো-স্টের-নের মাত্রা ঠিক রাখতে একটি নির্দিষ্ট,  ডায়েট-চার্ট মেনে চলতে হয়। ডায়েট চার্টটি তুলে ধরা হলো- নিয়মিত ব্যায়াম করা, ডায়েটে প্রোটিন, ফ্যাট এবং কার্বো-হাইড্রেট এর ভার-সাম্য ঠিক রাখা,  ভিটামিন ডি এর মাত্রা ঠিক রাখা, স্ট্রেসের পরিমাণ কমানো, নিয়মিত ৭-৮ ঘন্টা ঘুমানো, এই ডায়েট-চার্ট মেনে চললে টেস্টো-স্টেরন কমার ঝুঁকি অনে-কাংশে কমে যায়। …

  • কোলে-স্টেরল সম্পর্কে ভুল ধারণা

    কয়েক দশক ধরে আমাদের চিকিৎসকরা বলে আসছেন, কোলে-স্টেরল স্ট্রোক ও হৃদ রোগের মূল কারণ এবং এসব রোগ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের রক্তে কোলে-স্টেরলের মাত্রা কমাতে হবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ১৯৮৭ সালে ‘দ্য জার্নাল অব দি অ্যামেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে’ প্রকাশ করেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষের মৃত্যুর কারণের সঙ্গে রক্তে, কোলে-স্টেরলের মাত্রার কোনো সম্পর্ক নেই। ওই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আরও, দেখা…

  • খাদ্য বাহিত অসুস্থতা

    অনুজীব দ্বারা সংক্রামিত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে খাদ্য জনিত রোগের উদ্ভব হয় সাধা- রণতঃ অপরিচ্ছন্নতা, অসচেতনতা, অপুষ্টি, সঠিকভাবে রান্না না করা এবং সঠিকভাবে খাদ্য গুদামজাত করণের অভাবে খাদ্য দ্রব্যের দূষণ ঘটে থাকে। এসব দূষিত খাদ্য গ্রহণ করার ফলে নানা রকম শারীরিক অসুবিধা বিশেষ করে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা এবং এর সাথে সম্পর্কিত অসুস্থতা দেখা দেয়। এ ধরনের…

  • থাইরয়েডজনিত সমস্যা ও তার প্রতিকার

    থাইরয়েড হরমোন আসলে মেয়েদের থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা, ছেলেদের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এটাকে আমরা অটো-ইমিউন ডিজিজ বলি। অটো-ইমিউন ডিজিজ মেয়েদেরই বেশি হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে আমরা যখন সিম্পটন বুঝি, একটা মেয়ে মোটা হয়ে যাচ্ছে, তার গলাটা কর্কশ হয়ে যাচ্ছে, চুল পড়ে যাচ্ছে, মাসিক বেশি বেশি হচ্ছে, পায়খানা কষা হচ্ছে, চামড়া খস খসে হয়ে যাচ্ছে; আমরা…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *