হেপাটাইটিস বি একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ যা যকৃত বা লিভারকে আক্রমণ করে

০১) হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) এর আক্রমণে এ রোগ হয়। অনেক সময় সংক্রমণের প্রথম দিকে কোন লক্ষন প্রকাশ পায় না।

তবে অনেক ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, চামড়া হলুদ হওয়া, ক্লান্তি, পেট ব্যাথা, প্রস্রাব হলুদ হওয়া প্রভৃতি লক্ষন দেখা যায় সাধারনতঃ এই লক্ষনগুলো কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয় এবং কদাচিৎ লক্ষ্মণ প্রকাশ পাওয়ার পর পরিশেষে মৃত্যু হয়।

০২) সংক্রমণের পর রোগের লক্ষন প্রকাশ পেতে ৩০ থেকে ১৮০ দিন সময় লাগতে পারে। জন্মের সময় আক্রান্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ৯০% ক্রনিক বা দীর্ঘ স্থায়ী হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত হন যেখানে ৫ বছর বয়সের পর আক্রান্ত হওয়া রোগীদের ১০% এরও কম এতে আক্রান্ত হন।

০৩) দীর্ঘস্থায়ী হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগেরই কোন প্রাথমিক লক্ষন থাকে না। যদিও এ ক্ষেত্রে ইহা ধীরে ধীরে ইহা সিরোসিস এবং যকৃতের ক্যান্সার এ রূপ নিতে পারে।

০৪) দীর্ঘস্থায়ী আক্রান্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ১৫ থেকে ২৫% মৃত্যুবরণ করতে পারে।
হেপাটাইটিস বি ইলেক্ট্রিক মাইক্রোস্কোপে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বিশেষত্ব সংক্রামক রোগ।এই ভাইরাসটি রক্ত কিংবা দেহনিঃসৃত তরলের মাধ্যমে ছড়ায়।

যে সব জায়গায় এ রোগের প্রকোপ বেশি সেখানে সাধারনতঃ শিশুর জন্মের সময় কিংবা শৈশবে অন্য আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের মাধ্যমে এ রোগ সব চেয়ে বেশি ছড়ায়। কিন্তু যে সব জায়গায় এ রোগের প্রকোপ কম সেখানে শিরায় মাদক দ্রব্যের ব্যবহার এবং অরক্ষিত যৌন মিলন এ রোগের প্রধান কারণ।

এ ছাড়াও রক্ত আদান-প্রদান, ডায়ালাইসিস, আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে বসবাস, সংক্রমণের হার বেশি এমন স্থানে ভ্রমণ প্রভৃতি মাধ্যমেও এ রোগ ছড়ায়। ১৯৮০ সালের দিকে ট্যাটু এবং আকুপাংচারের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হয়েছিলেন যদিও বর্তমানে এ ধরনের মাধ্যমে সংক্রমণ কমে এসেছে।

০৫) হাত ধরা, খাবারের তৈজসপত্র শেয়ার করা, চুম্বন, কোলাকুলি করা, হাঁচি-কাশি, কিংবা মাতৃ দুগ্ধ পানের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় না। সংক্রমণের পর ৩০ থেকে ৬০ দিন পর এ রোগ নির্ণয় করা যায়।

সাধারনতঃ রক্তে অবস্থিত ভাইরাস এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থিত অ্যান্টিবডি থেকে এ রোগ নির্ণয় করা হয়।  এটি পরিচিত পাঁচটি  হেপাটাইটিস ভাইরাসের মধ্যে অন্যতম একটি: এ, বি, সি, ডি, এবং ই। ১৯৮২ সাল থেকে টীকার মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

০৬)  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে জন্মের প্রথম দিনেই এ রোগের টীকা নেয়া উচিত। সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য আরও ২-৩ টি ডোজ নেয়া প্রয়োজন।

০৭) প্রায় ৯৫% ক্ষেত্রেই এই টীকা কাজ করে।  জাতীয় কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ২০০৬ থেকে বিশ্বের প্রায় ১৮০ টি দেশে এই রোগের প্রতিষেধক টীকা দেয়া হয়।

০৮)  ইহা সুপারিশ করা হয়ে থাকে যে সব ধরনের রক্ত আদান-প্রদানের পূর্বে পরীক্ষা করে দেখা এবং সংক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কনডম ব্যবহার করা।

প্রাথমিক সংক্রমণের ক্ষেত্রে, রোগের লক্ষ্মণ অনুযায়ী রোগীর যত্ন নেওয়া হয় । দীর্ঘস্থায়ী আক্রান্ত রোগীদের বেলায়, টেনোফোবির বা ইন্টারফেরোনের মতো সংক্রমণ ধ্বংসকারী ঔষধ কার্যকর হতে পারে; যদিও, ঔষধ- গুলো অনেক দামী।

০৯) সিরোসিসের জন্য অনেক সময় যকৃত প্রতিস্থাপন করা হয়ে থাকে। পৃথিবীর মোট জন সংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তাদের জীবদ্দশার কোন এক সময় এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৪ থেকে ৩৫ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে আক্রান্ত।

১০) ২০১৩ সালে প্রায় ১৩ কোটি মানুষ নতুন করে এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

১১) এ রোগে প্রতি বছর ৭.৫ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। এদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ মারা যায় যকৃতের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে।

১২)  বর্তমানে এ রোগটি শুধুমাত্র পূর্ব এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় বেশি দেখা যায়। এ সব অঞ্চলে প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে ৫-১০% দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে আক্রান্ত। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় আক্রান্তের হার ১% এরও কম। এটি মূলত “সেরাম হেপাটাইটিস” নামে পরিচিত ছিল।

১৩)  হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের প্রতিষেধক সমৃদ্ধ খাবার তৈরির গবেষণা চালানো হচ্ছে।

১৪) এই রোগটি অন্যান্য হোমিনিডদের মাঝেও সংক্রমিত হতে পারে।

Similar Posts

  • পোলিও রোগ বা পোলিওমাইলাইটিস কি

    পোলিও রোগ বা পোলিও মাইলাইটিস, সাধারণতঃ পোলিও নামে পরিচিত, একটি নিউরো-মাস্কুলার ডিজেনারেটিভ অর্থাৎ স্নায়ু পেশীর অপক্ষয় রোগ। এই রোগের কারণ হল পিকর্নাভাইরাইডে পরিবারের একটি ভাইরাস । এই ভাইরাস মেরুদণ্ড এবং ব্রেনস্টেমের অ্যানটেরিয়র হর্ন মোটর নিউ- রনকে আক্রমণ করে; এই মোটর নিউরন আর সেরে ওঠে না এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কঙ্কাল পেশীর গঠন বিকৃত ভাবে হয়।ইহা…

  • ইউরিক এসিড কি, কেনো হয়, করণীয়

    উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিডের কারণে গেঁটে বাত বা গিরায় গিরায় ব্যথা, উচ্চ রক্ত চাপ, কিডনি অকেজো হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতি দিনের খাবারের মধ্যে কিছু আছে যে গুলোতে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি।  আবার কিছু পুষ্টিকর খাবার আছে যেগুলো ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে, ঔষধের মত কাজ করে। বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা আমিষ খেলে অথবা…

  • নিউ ইয়র্ক সিটির পয়ঃ নিষ্কাশনের নর্দমায় পোলিও ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে । রাজ্য জুড়ে জরুরী অবস্থা জারী করা হয়েছে যুক্ত রাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গ রাজ্যে পোলিও রোগের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়ার পর রাজ্যের গভর্নর জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। আমেরিকান কর্মকর্তারা বলছেন নিউ ইয়র্ক শহর এবং আশ পাশের চারটি এলাকার পয়ঃ নিষ্কাশন নর্দমা থেকে নেওয়া নমুনা…

  • যে কারণে দাঁতের ক্ষতি হয়

    এমন সুন্দর হাসির জন্য দাঁতের যত্ন নিতে হবে। অনেকেই হয়তো জানি না প্রতি দিনের কী কী ভুলের কারণে মূল্যবান দাঁত গুলো অকালে হারিয়ে ফেলছি।  দাঁতের ক্ষতি প্রতিরোধের সহজ নিয়ম গুলো না মানার কারণে একটি দাঁতকে চিকিৎসা করে বাঁচাতে কয়েক হাজার টাকা খরচ করি।  দাঁতের যত্নে বিশেষ কয়েকটি ভুল সংশোধন করে সময় মতো সঠিক ভাবে যত্ন নেওয়ার গুরুত্ব…

  • গুরুত্বপূর্ণ হরমোন (টেস্টোস্টেরন) সমস্যা ও সমাধান

    পুরুষের দেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন হলো টেস্টো-স্টেরন। এই হরমোনের ওপরই নির্ভর করে পুরুষের শারীরিক উর্বরতা। নারী দেহেও সামান্য পরিমাণে এই হরমোন দেখা যায়। পুরুষের শরীরে এই হরমোন কমে গেলে কী কী লক্ষণ দেখা দেয়— ১. অবসাদঃ দুপুরের খাবারের পর অনেকেরই দুর্বল ভাব চলে আসে। অফিসের টেবিলে প্রায়ই উদ্দীপনা হারিয়ে যায়। যে কোনো উদ্যমী কাজে…

  • কলেরা, প্লেগ, হাম, প্লেগ অব মার্সেই আরো অন্যান্য মহামারি রোগ

    ১৮১৭ সালে পানি বাহিত জীবাণুর কারণে রাশিয়ায় প্রথম কলেরা মহামারি দেখা দেয়। এতে রাশিয়ায় এক মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। রাশিয়া থেকে ব্রিটিশ সৈন্যরা কলেরার জীবাণু বহন করে ভারতে আসে। ভারতে কলেরার বিস্তার ঘটতে থাকে এবং লক্ষ লক্ষ লোক মারা যেতে থাকে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে ভারত থেকে কলেরা সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে, স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান,…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *