কী ধরনের হার্টের অসুখ হতে পারে

উত্তর: প্রধানতঃ হৃদ সংবহন তন্ত্র, মস্তিষ্ক, বুক ও প্রান্তিক ধমনীর সম্পর্কিত রোগকে হৃদ রোগ বলা হয়। হৃদ রোগ জন্মগত হতে পারে। আবার বড় হওয়ার পরেও হতে পারে। হার্টের যে স্বাভাবিক গতি সেটা কম বা বেশি হলেই মানুষ সাধারণতঃ হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়। ইহা যে কোনও বয়সেই হতে পারে।

সাধারণ ভাবে হার্ট সংক্রান্ত কোনও অসুখকেই হৃদ রোগ বলা হয়ে থাকে। যেমন- করোনারি হৃদ রোগ, কার্ডিও মায়োপ্যাথি, উচ্চ রক্ত চাপ জনিত হৃদ রোগ, হার্ট ফেইলিওর, হৃদ পিণ্ডের ডান পাশ অচল হয়ে যাওয়া, শ্বাস প্রশ্বাস ব্যহত হয়ে যাওয়া, ভালভুলার ডিজিস ইত্যাদি হার্টের অসুখের মধ্যে পড়ে।

প্রশ্ন: হার্টের কি কি সমস্যা আছে?

হৃদ পিণ্ডের মাঝে করোনারি আর্টারি নামে দুটি ছোট ছোট ধমনী থাকে। এরাই হৃদ পিণ্ডকে সচল রাখতে সাহায্য করে বা হৃদ পিণ্ডকে পুষ্টির জোগান দেয়। কোনও কারণে এই করোনারি আর্টারি যদি ব্লক হয়ে যায় তাহলে যে এলাকায় ওই আর্টারি বা ধমনী রক্তের পুষ্টি পৌঁছে দেয় সে জায়গার হৃদ পেশি কাজ করে না। তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়। এই সমস্যা যে কোনও সময় হতে পারে। কাজ করতে করতে, ঘুমের ঘোরে সকালে-রাতে হতে পারে। হঠাৎ ভারী কোনও কাজ করলে, বাইরে ঠাণ্ডা আব হাওয়ায় থাকলেও এই রোগ হতে পারে।

প্রশ্ন: হার্টের অসুখ আছে বুঝব কি করে?

উত্তর: সাধারন ভাবে হার্টের অসুখ থাকলে বুকে অসহ্য ব্যথা অনুভূত হয়। সেই সঙ্গে ঘাম এবং শরীর খারাপ লাগে। ক্রমাগত শরীর খারাপ করতে থাকলে হার্টের অসুখ হতে পারে। হার্টের করোনারি আর্টারি বা ধমনী ব্লকেজ থাকলে মানুষের শরীরে নানা সমস্যা হয়। অনেক সময় এই সমস্যা গুলি নিঃশব্দে দানা বাঁধে।

প্রশ্ন: রোগীর কোন কোন লক্ষণ দেখলে বোঝা যাবে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?

বুকে ব্যথা, ঘাম, নিঃশ্বাসে কষ্ট, মাথা ধরা এই সব লক্ষণ দেখলে বোঝা যায় রোগীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। হাতে -পায়ে ঝিন ঝিনও ধরতে পারে। মূলতঃ রক্তে এল ডি এল (খারাপ) কোলেস্ট্রেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং এইচ ডি এলের (ভালো)মাত্রা কমে গেলে মানুষের হার্ট অ্যাটাক হয়।

প্রশ্ন: হার্ট অ্যাটাক হলে প্রাথমিক পদক্ষেপ কি?

প্রথমতঃ আক্রান্ত ব্যক্তিকে একদম বিশ্রাম নিতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

তৃতীয়তঃ নিয়মিত ই সি জি পরীক্ষা, ব্লাড সুগারের পরীক্ষা এবং ব্লাড প্রেসার পরীক্ষা করাতে হবে।

প্রশ্ন: হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধের ব্যপারে কি করতে পারি?

দিনে অন্ততঃ এক মাইল হাঁটতে হবে। ধূম পানের অভ্যাস থাকলে তা বর্জন করতে হবে। মদ্য পান বন্ধ করতে হবে। নিয়মিত রক্তের সিরাম, লিপিড পরীক্ষা করাতে হবে। অত্যধিক পরিশ্রমও করা যাবে না। ব্লাড সুগার এবং প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

প্রশ্ন: এখন তো কথায় কথায় শুনি অ্যাঞ্জিওপ্লাস্ট করে স্টেণ্ট বসাতে হবে। দরকার না থাকলেও স্টেন্ট বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কখন আঞ্জিওপ্লাস্ট করতে হবে?

করোনারি আর্টারির মধ্যে রক্ত সঞ্চালন ঠিক আছে কিনা দেখবার জন্য অ্যাঞ্জিওগ্রাফি করা হয়। অ্যাঞ্জিওগ্রাফি করে যদি দেখা যায় এক বা ততোধিক করনারি আর্টারি ব্লক রয়েছে তখন স্টেন বসানো হয়।

প্রশ্ন: অ্যাঞ্জিওপ্লাস্ট বিষয়টা কি?

সমস্ত শরীরে জালের মতো ছড়িয়ে আছে রক্ত নালী। এটাই রক্ত চলাচলের মসৃণ রাস্তা। এর মধ্যে বিশুদ্ধ রক্ত যাতায়াতের রাস্তাকে ধমনী বলা হয়। আর দূষিত রক্ত যাতায়াতের রাস্তাকে শিরা বলে। বিভিন্ন কারণে রক্ত নালীতে চর্বি জমলে রক্ত যাতায়াতের পথ বাধা প্রাপ্ত হয়। তখন কোনও কাটা ছেড়া না করে রক্ত নালীর ব্লক দূর করার নাম অ্যাঞ্জিওপ্লাস্ট। স্টেন বা রিং বসিয়ে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্ট করা হয়।

প্রশ্ন: হার্ট অ্যাটাক হলে বাইপাস করা হয় না?

যদি তিনটে করোনারি আর্টারিতে ব্লকেজ থাকে তাহলে সাধারণতঃ বাইপাস করা হয়।

প্রশ্ন: ঔষধ দিয়ে চিকিৎসা কখন?

যখন দেখা যায় রোগীর কোনও বড় সমস্যা নেই এবং করোনারি আর্টারিতে ব্লকেজ নেই তখন ঔষধ দিয়েই চিকিৎসা করা হয়।

বাইপাস করা হলে নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দশ পনেরো বছর পরে আবার পরীক্ষা করানো দরকার। বাইপাস করলেও হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা থেকেই যায়।

প্রশ্ন: অপারেশনের পর সমস্যা যাতে ঘুরে না আসে, তার জন্য কি করব?

অপারেশনের পর যাতে আবার সমস্যা না হয় তার জন্য নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে হবে। ব্লাড প্রেসার এবং সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। খাদ্যাভাস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সব কিছুর পাশা পাশি প্রতি দিন হাঁটতে হবে।

প্রশ্ন: খাওয়ার ব্যপারেও তো অনেক বিধি নিষেধ রয়েছে?

সাধারণভাবে তেল, ঘি এবং চর্বি জাতীয় জিনিস না খাওয়াই ভাল। মশলাদার খাবারও কম খেতে হবে। সুগার থাকলে মিষ্টি জাতীয় জিনিস বর্জন করতে হবে। সেই সঙ্গে অত্যধিক নুনও খাওয়া যাবে না।

প্রশ্ন: হৃদরোগ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয় এমন মানুষেরা কিভাবে হৃদ যন্ত্রের যত্ন নিতে পারেন?

নিয়ম মেনে সাধারণ খাওয়া দাওয়া করতে হবে। নিয়মিত হাঁটতে হবে। এ ছাড়া মদ্য পান, ধূম পান এড়িয়ে চলতে হবে। ব্লাড সুগার এবং ব্লাড প্রেসার থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হবে। সেই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রশ্ন: মাঝে মাঝে শোনা যায় সুস্থ মানুষ হৃদ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে যা খুবই দুঃখজনক। এ বিষয়টি কেমন ?

সত্যিই বিষয়টা খারাপ। কিন্তু এটা হতে পারে। অনেক সময় কারণ জানা যায় না। তবুও মানুষ হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়।

প্রশ্ন: মানুষ কি উত্তরাধিকার সূত্রে হৃদ রোগে আক্রান্ত হতে পারে?

না ; এটি বংশ গত রোগ নয়। সাধারণতঃ উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ হৃদ রোগে আক্রান্ত হয় না। এটি জীবন যাত্রার উপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন: হৃদ যন্ত্রের উপর চাপ পড়ে কেন? এর থেকে উত্তরনের উপায় কি?

অনিয়ম খাওয়া দাওয়া, রাত জাগা, অত্যধিক চিন্তা, শরীর নিয়ে সচেতনতার অভাবে অনেক সময় হৃদ যন্ত্রের উপর চাপ পড়ে। এ গুলি এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

প্রশ্ন: নিম্ন রক্ত চাপে যারা ভোগেন তাঁরা কি হৃদ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন?

উচ্চ রক্ত চাপ যাঁদের তাঁরা হৃদ রোগে বেশি আক্রান্ত হন। তবে নিম্ন রক্ত চাপ যাঁদের তাঁরাও হৃদ রোগের শিকার হতে পারেন।

প্রশ্ন: হৃদ যন্ত্রের জন্য সব চেয়ে ভালো এবং সব চেয়ে খারাপ খাবার কোনটি?

সাধারণতঃ শাকসব্জী এবং ফল হৃদ যন্ত্রকে ভালো রাখে। আর তৈলাক্ত খাবার হৃদ যন্ত্রের ক্ষতি করে। এছাড়া খাবারে পরিমিত লবণ খেতে হবে।

প্রশ্ন: হৃদ রোগের ব্যথা এবং এবং গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার মধ্যে পার্থক্য করা যায় কিভাবে?

উত্তর: হৃদ রোগের ব্যথার সঙ্গে প্রেসার কম থাকবে, ঘাম হবে, বুকে ব্যথা হবে। এবং হৃদ রোগের ব্যথা ঔষধ খেলে চট করে সেরে যায় না। অন্য দিকে গ্যাসট্রিকের ব্যথা পেটের উপরে দিকে হয় এবং হার্টে চাপ সৃষ্টি করে। গ্যাস, অম্বল, বমি হয়। ঔষধ খেলে চট জলদি কমে যায়। তবে সাধারণ ব্যক্তিরা সব সময় এ পার্থক্য করতে পারেন না। এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন: মাঝে মাঝে মানুষকে অনেক রাত পর্যন্ত অফিসে থাকতে হয়। এতে কি হৃদ যন্ত্রের ক্ষতি হয়। যদি হয় এ ক্ষেত্রে কি করা যেতে পারে?

রাত জাগা শরীরের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। অফিসে থাকলে ঠিক মতো বিশ্রাম নেওয়া যায় না। এর থেকে অনেক রকম অসুখই হতে পারে। সম্ভব হলে এটি এড়ানো উচিত।

Similar Posts

  • থাইর-য়েড ক্যান্সার  কোন বয়সের লোকদের বেশি ঝুঁকি থাকে

    থাইর-য়েড ক্যান্সার মূলত দুই ধরণের হয়ে থাকে।  এক অল্প বয়সে হতে পারে আবার শেষ বয়সেও হতে পারে।  বয়স্ক অবস্থায় থাইর-য়েড আক্রান্ত হলে-এর অবস্থা খুবই খারাপ হয়।  বেশি বয়সের রোগীদের সঙ্গে সঙ্গে  সতর্কতার সাথে,  অস্ত্র পাচার করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসক গণ।  থাইরয়েড আক্রান্ত ব্যক্তিকে কি কি পরীক্ষা করে থাকেন? রোগীকে সম্পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য এফটি থ্রি,…

  • বিউবনিক প্লেগ (ইংরেজি:  Bubonic plague) কি

    বিউবনিক প্লেগ (ইংরেজি: Bubonic plague) হল ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামক ব্যাক্টেরিয়া ঘটিত প্লেগ রোগের তিনটি প্রকারের একটি। [১] জীবাণুর সংস্পর্শে আসার ১ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। [২] উপসর্গগুলো হল জ্বর, মাথাব্যথা, বমি। [৩] ত্বকের যে স্থান দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করে তার নিকটবর্তী লসিকা গ্রন্থি ফুলে যায় ও ব্যথা হয়। মাঝে মধ্যে ফোলা লসিকা গ্রন্থি ফেটে যেতে পারে। বিউবনিক প্লেগঃ বিউবনিক প্লেগ রোগে আক্রান্ত রোগীর…

  • দাঁতে গর্ত হলে

    দাঁতে গর্ত এবং মাঝে মধ্যেই ব্যথা হলে ;দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। ফেলে রাখলেই ছড়িয়ে যায় দাঁতে সংক্রমণ। যা প্রাণ সংশয়ও ডেকে আনতে পারে। এমনিতেই দীর্ঘ দিন ধরে দাঁতের সমস্যা ফেলে রাখলে অনেক বিপত্তি।  তাই যদি ডাক্তার বলেন দাঁত তোলা কিংবা রুট ক্যানাল (Root Canal Treatment),করা ছাড়া কোনও উপায় নেই তাহলে দেরি করা মানে জেনে বুঝে বিপদ ডেকে…

  • |

    থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ

    থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্ত স্বল্পতা জনিত রোগ। ইহা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। রক্তের ক্যানসারও নয়। প্রকারভেদঃ ক্লিনিক্যালি থ্যালাসেমিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন-থ্যালাসেমিয়া মেজর, মাইনর এবং ইন্টার মিডিয়েট।থ্যালাসেমিয়ার অনেক প্রকারভেদ আছে। যেমন-বিটা থ্যালাসেমিয়া, ই-বিটা থ্যালাসে- মিয়া, হিমোগ্লোবিন ই-ডিজিজ, আলফা থ্যালাসেমিয়া, এস বিটা থ্যালাসেমিয়া, হিমোগ্লোবিন এস ডিজিজ, হিমোগ্লোবিন ডি পাঞ্জাব, হিমোগ্লোবিন ডি আরব ইত্যাদি।…

  • লিভার ফেইলিউর রোধে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণ জরুরি

    লিভার ফেইলিউরের ভয়াবহতা, চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে লিভারের কার্য – ক্ষমতা যখন কমে যায় অথবাশরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী যখনই এটা কাজ করতে পারে না তখনই এটাকে লিভারফেইলিউর বলা হয়।  একে তিন ভাগে ভাগ করা যায়ঃ এক. আকস্মিক ফেইলিউর,  দুই.   দীর্ঘমেয়াদি ফেইলিউর,  তিন. দীর্ঘমেয়াদি আকস্মিক ফেইলিউর। আর ভয়াবহের মধ্যে যদি আমরা ভাগ করি…

  • জলাতঙ্ক সম্পর্কে যা জানা জরুরি

    জলাতঙ্কঃ একে হাইড্রোফোবিয়া কিংবা পাগলা রোগও বলা হয়। আক্রান্ত রোগী পানি দেখে বা পানির কথা মনে পড়লে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বলে এই রোগের নাম হয়েছে জলা তঙ্ক। এটি প্রাণি বাহিত র‌্যাবিস ভাইরাসঘটিত রোগ, রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর আক্রান্ত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে এক জন এবং…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *