|

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ


থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্ত স্বল্পতা জনিত রোগ। ইহা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। রক্তের ক্যানসারও নয়।

প্রকারভেদঃ

ক্লিনিক্যালি থ্যালাসেমিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন-থ্যালাসেমিয়া মেজর, মাইনর এবং ইন্টার মিডিয়েট।
থ্যালাসেমিয়ার অনেক প্রকারভেদ আছে। যেমন-বিটা থ্যালাসেমিয়া, ই-বিটা থ্যালাসে- মিয়া, হিমোগ্লোবিন ই-ডিজিজ, আলফা থ্যালাসেমিয়া, এস বিটা থ্যালাসেমিয়া, হিমোগ্লোবিন এস ডিজিজ, হিমোগ্লোবিন ডি পাঞ্জাব, হিমোগ্লোবিন ডি আরব ইত্যাদি।

থ্যালাসেমিয়া বাহক/মাইনর/ট্রেইট/হেটারোজাইগোস স্টেট অব থ্যালাসেমিয়া একই কথা। হোমোজাইগোস স্টেটকে থ্যালাসেমিয়া মেজর বা রোগী বলা হয়। থ্যালাসেমিয়ার বাহক আর থ্যালাসেমিয়ার রোগী এক কথা নয়।

লক্ষণ কীঃ

থ্যালাসেমিয়ার বাহক স্বাভাবিক মানুষরূপে বেড়ে ওঠে। তাই কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, তা বাহ্যিকভাবে বোঝার কোন উপায় নেই। আর থ্যালাসেমিয়ার রোগী জন্মের ৬ মাস বয়স থেকে ফ্যাকাসে হয়ে যায়, জন্ডিস দেখা দেয়। পেটের প্লিহা ও লিভার বড় হয়ে যায়। ঠিকমতো শরীরের বৃদ্ধি হয় না।

চিকিৎসাঃ

রক্ত স্বল্পতার জন্য প্রতি মাসে ১ থেকে ২ ব্যাগ রক্ত শরীরে নিতে হয়। ঘন ঘন রক্ত নেওয়ায় ও পরিপাক নালি থেকে আয়রনের শোষণ ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় শরীরে আয়র- নের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে লিভার, হৃদ পিণ্ড সহ অন্যান্য অঙ্গের নানা রকম মারাত্মক জটিলতা দেখা দেয়। সঠিক চিকিৎসা ও নিয়মিত রক্ত না নিলে থ্যালাসে- মিয়া রোগী মারা যায়।

প্রতিবার রক্ত নেওয়া ও আয়রন কমানোর ঔষধসহ অন্যান্য খরচে একজন থ্যালাসে- মিয়া রোগীর চিকিৎসায় প্রতি মাসে হাজার টাকার বেশি খরচ হয়।

নিয়মিত রক্ত দিয়ে রক্ত রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সঠিক চিকিৎসা করালে থ্যালাসেমিয়া রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হলেও সঠিক চিকিৎসা বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট অত্যন্ত ব্যয় বহুল। তাই সবার পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না।

খাদ্য উপদেশঃ

থ্যালাসেমিয়ার বাহক আর থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবারের উপদেশ এক নয়। থ্যালাসেমিয়ার বাহকের খাবার স্বাভাবিক মানুষের মতো। আয়রন জাতীয় খাবারের নিষেধ নেই। বরং আয়রনের ঘাটতি হলে বেশি বেশি আয়রন জাতীয় খাবার খেতে দিতে হয়।

আর থ্যালাসেমিয়া রোগীর জন্য আয়রন জাতীয় খাবার কম খেতে হয় এবং প্রয়োজনে শরীর থেকে আয়রন কমানোর ঔষধ দিতে হয় যা ব্যয় বহুল। তবে কোনো কারণে আয়রনের ঘাটতি থাকলে অবশ্যই আয়রন জাতীয় খাদ্য ও ঔষধ দিতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়ঃ

বাবা ও মা দুজনই থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলে সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

জেনেটিক কারণেও থ্যালাসেমিয়া হতে পারে
মানবদেহে ২৩ জোড়া বা ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। এ প্রতি জোড়ার অর্ধেক মায়ের আর বাকি অর্ধেক বাবার থেকে আসে। ১৬নং ক্রোমোজোমে থাকে আলফা জিন আর ১১নং ক্রোমোজোমে থাকে বিটা জিন। আলফা ও বিটা জিনদ্বয় আলফা ও বিটা গ্লোবিন নামক প্রোটিন তৈরি করে যা অনেক গুলো এমাইনো এসিডের সমষ্টি ।

জন্মগত ভাবে ১৬ অথবা ১১নং ক্রোমোজোমের আলফা অথবা বিটা জিন সঠিক ভাবে এমাইনো এসিড তৈরি করতে পারে না। ফলে আলফা অথবা বিটা গ্লোবিন নামক প্রোটিন ত্রুটি পূর্ণ হয়। আলফা অথবা বিটা গ্লোবিন চেইন ত্রুটি পূর্ণ থাকায় হিমো- গ্লোবিন ত্রুটি পূর্ণ হয়। স্বাভাবিক মানুষের লোহিত রক্ত কণিকার গড় আয়ু ১২০ দিন হলেও থ্যালাসেমিয়া রোগীর ত্রুটি পূর্ণ গ্লোবিনের কারণে লোহিত রক্ত কণিকার গড় আয়ু মাত্র ২০ থেকে ৬০ দিন। অপরিপক্ব অবস্থায় লোহিত রক্ত কণিকা ভেঙ্গে যায় বা মারা যায় তাই রক্ত স্বল্পতা দেখা দেয়।
বাংলাদেশে এর চিকিৎসায় সমস্যা কোথায়
থ্যালাসেমিয়া স্ক্রেনিং প্রোগ্রাম না থাকায়, অনেকেই জানেন না তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। তাই অজান্তেই থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে এবং দিন দিন থ্যালাসেমিয়া রোগী বাড়ছেই।

করণীয়ঃ

  • দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে না হওয়া বা বন্ধ করা। একজন সুস্থ মানুষ যে কাউকে (বাহক বা রোগীকে) বিয়ে করতে পারবে। কারণ তাদের সন্তান রোগী হওয়ার সম্ভবনা নেই। তবে এক জন বাহক আরেক জন বাহককে বিয়ে করতে পারবে না। কারণ সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে।
  • দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে যদি বিয়ে হয়েই যায় বা স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয়, তবে বাচ্চা পেটে আসার আট থেকে চৌদ্দ সপ্তাহের মধ্যে ক্রওনিক ভিলাস স্যাম্পল বা এমনিওসেন্টে- সিস করে বাচ্চার অবস্থা জানা যায়।

পেটের বাচ্চা থ্যালাসেমিয়ার রোগী হলে কাউন্সিলিং করতে হবে যাতে একজন নতুন থ্যালাসে- মিয়া রোগীর জন্ম না হয়। তাই বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রত্যেককে জানতে হবে থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা। দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গেলেই থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কীভাবে জানবেন আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি নাঃ

হেমাটোলজি অটো এনালাইজার মেশিনে রক্তের সিবিসি পরীক্ষায় থ্যালাসেমিয়া বাহকের ধারণা পাওয়া যায়। এর পর হিমো- গ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া বাহক কি না নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে ডিএনএ এনালাইসিস পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়।

Similar Posts

  • সব ছেড়ে যাবে !

    মনটা তোমার থাকে যদি ভালোজ্বালাতে পারো সমাজে আলো। ইহাকে যদি ভালোই রাখতে চাওইবাদত বন্দেগী বেশী করে যাও! উপাসনা আরাধনায় রয়না কষ্টআল্লাহর কাজে হবেনা পথভ্রষ্ট! কল্যাণের কাজ যেওনা এড়িয়েদয়া প্রার্থীদেরও দিওনা তাড়িয়ে! সৃষ্টিকর্তার কাজে দিওনা ফাঁকিতাঁর সন্তোষ্টির পথে সবাই থাকি! দালান কোঠা অট্রালিকা ও বাড়িএসব যত আছে যেতে হবে ছাড়ি! আল্লাহ রাসুলের কাজ করে গেলেদুনিয়া আখেরাতে…

  • হার্টের রোগ দূরে থাকে যেসব খাবার খেলে

    হার্টের সুস্থতার ওপর নির্ভর করে শরীরের সুস্থতা। নিঃশব্দ ঘাতক হার্ট অ্যাটাক আমাদের জীবনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। হার্ট বা হৃদয় আমাদের শরীরের সব চেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ অঙ্গ। তা সত্ত্বেও আমরা হার্টের স্বাস্থ্য নিয়ে উদাসীন। কিছুটা জেনে-বুঝে আবার কখনও অজান্তেই আমরা হৃদয়কে গুরুত্ব দিই…

  • চোখের জ্যোতি বাড়াতে

    চোখের জ্যোতি বাড়াতে কয়েকটি খাবারের গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমেই ভিটামিন ‘এ’–এর কথা চলে আসে। বেশ কয়েক বছর আগের এক জরিপে আমাদের দেশে ভিটামিন -এর অভাবে শিশুদের অন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে তথ্য মিলেছে। এর সংখ্যাও কম নয়, ৩০ হাজারের মতো। এতেই বোঝা যায়, অন্ধত্বের সঙ্গে ভিটামিন এর সম্পর্ক নিবিড়। আবার দীর্ঘদিন ‘ক্র্যাশ’ ডায়েটের ফলেও দৃষ্টি…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *