বসন্ত রোগ, ভূলেও কুসংস্কারে জড়িত হবেন না
এখন আবহাওয়া পরিবর্তনের সময়। এই সময়ে জলবসন্ত রোগের প্রকোপ কিছুটা বাড়ে। কুসংস্কার দূরে সরিয়ে, নিয়ম মানলে এবং ঠিক মতো যত্ন নিলে সে ভাবে ভয়ের কিছু নেই। তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জানাচ্ছেন চিকিৎসক দেবতনু দত্ত — শুধু বসন্তকালে নয়, বছরের যে কোনও সময়েই এই রোগ হতে পারে। তবে বছরের প্রথম ছ’মাস অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেই এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
প্রশ্ন: বসন্ত রোগ কী?
উত্তর: বসন্ত রোগ বলতে আমরা সেই রোগ- টিকেই বুঝি, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলা হয় চিকেন পক্স। একে অনেকে জল বসন্তও বলেন । আর এক ধরনের পক্স আগে হত । সেটা হল স্মল পক্স বা গুটি বসন্ত । ইহা এখন আর হয় না ।
বসন্তকালে কি এই রোগের প্রকোপ বাড়ে?
শুধু বসন্তকালে নয়, বছরের যে কোনও সময়েই এই রোগ হতে পারে। তবে বছরের প্রথম ছ’মাস অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেই এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
চিকেন পক্স কেন হয়?
ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই ইহাও একটি ভাইরাস ঘটিত রোগ। ভ্যারিসেলা জস্টার (ভি-জেড ভাইরাস) নামে এক ধরনের ভাইরাসের জন্য এই রোগ হয়। অনুকূল আবহাওয়া পেলেই এই ভাইরাস সক্রিয় হয় ওঠে।
চিকেন পক্সে আক্রান্ত হলে কী হয়?
প্রাথমিক ভাবে জ্বর হবে । পরের ২-৩ দিনের মধ্যে জ্বরের মাত্রা বাড়বে । তার সঙ্গে সারা শরীরে ব্যথা হবে । ২-৩ দিন পর থেকে শরীরে র্যাশ বের হবে। র্যাশ যখন বের হয়, তখন চুলকানির অনুভব হবে। প্রথমে শরী- রের মধ্য অংশের সামনের দিকে (বুক বা পেটে), পরে মুখ মণ্ডলে র্যাশ বের হয়। পরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পরে।
মুখ গহ্বর এবং গলার মিউকাস আবরণী- তেও র্যাশ বের হয় । ৫-৭ দিন পর্যন্ত র্যাশ বের হয় । সেটা ধীরে ধীরে জল ভরা ফোস্কার মতো আকার নেয়। পরে ফোস্কার ভিতরের রস ঘন হয়ে পুঁজের মতো হয়। ৭-১০ দিন পর থেকে তা শুকোতে থাকে। শুকিয়ে যাওয়ার পরে র্যাশ থেকে খোসা উঠতে শুরু করে। চিকেন পক্সে শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই রোগটি কী ভাবে ছড়ায় ?
ইহা খুব ছোঁয়াচে রোগ। এই কারণে খুব সহজে এবং দ্রুত আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ মানুষের দেহে তা ছড়িয়ে পড়ে । সাধারণতঃ আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা থুতুর সঙ্গে ভাইরাস ছড়ায় । এমনকি, রোগীর সংস্পর্শে এলেও রোগ ছড়াতে পারে । তা ছাড়া, ফোস্কার মধ্যে যে রস থাকে তার মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। ওই রস সুস্থ ব্যক্তির শরীরে লাগলে রোগ হতে পারে। তবে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। শরীরে ঢোকার ১৪-২১ দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।
আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে কত দিন অবধি রোগটি ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে ?
যত দিন র্যাশ বের হয় তত দিন তো বটেই, র্যাশ বের হওয়া বন্ধ হওয়ার পরেও দিন সাতেক পর্যন্ত এক জন আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে রোগটির সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
প্রশ্ন: কোন বয়সের মানুষের মধ্যে এই রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে?
উত্তর: ইহা নির্ভর করে শরীরের রোগ প্রতি- রোধ ক্ষমতার উপরে। সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এই ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। তবে ১-১৪ বছর পর্যন্ত বাচ্চাদের সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে।
প্রশ্ন: কোন ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি মারাত্মক?
উত্তর: গর্ভবতী মায়েদের, বয়স্ক মানুষদের এবং সদ্যজাতদের ক্ষেত্রে এই রোগটি মারা- ত্মক। এ ছাড়া যাঁরা ‘ইমিউনো কম্প্রোমাই- জড’ এবং যারা ‘স্টেরয়েড থেরাপি’-তে আছেন, অর্থাৎ যারা এমন কিছু ঔষধ খান, যে ঔষধ খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে এই রোগটি মারাত্মক হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় মায়ের চিকেন পক্স হলে গর্ভস্থ শিশুর জন্ম গত ত্রুটির ঝুঁকি থাকে। আর যদি প্রসবের দিন সাতেকের মধ্যে মায়ের এই এই রোগ হয়, তখন নব জাতকের মারাত্মক ধরণের জল বসন্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন ওই শিশুর বিশেষ চিকিৎসা ও যত্ন দরকার।
প্রশ্ন: এই রোগ থেকে কোনও জটিলতা তৈরি হতে পারে কি?
উত্তর: শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে বা কম থাকলে নানা জটিলতা হতে পারে। সাধারণ ভাবে যে সমস্যাগুলি হয় সেগুলি হল, র্যাশ বের হওয়ার সময় চুলকানি এলে অনেকে চুলকিয়ে ফেলেন। তখন তা থেকে ক্ষত এবং সংক্রমণ হতে পারে। নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কে প্রদাহও হতে পারে। এ ছাড়া স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি বা লিভারের সমস্যাও হতে পারে।