লিভার প্রতিস্থাপন বলতে কী বোঝায়

লিভার বা যকৃৎ হল একটি আবশ্যিক প্রত্যঙ্গ, যা পাচকনালী থেকে আসা রক্তকে পরিস্রুত করে পুরো শরীরে ছড়িয়ে দেয়। পেশি গড়ে তুলতে, সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে ও রক্তকে জমাট বাঁধতে না-দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যালকে বিষমুক্ত বা ডিটক্সিফাই করা, ঔষধ পত্রকে বিপাক বা মেটাবলাইজ করা এবং প্রোটিনকে সংশ্লে- ষিত বা সিন্থেসাইজ করার কাজ করে লিভার।

লিভার প্রতিস্থাপন কী এবং কখন এর প্রয়োজন হয়?

লিভার প্রতিস্থাপন হল এমন এক সার্জারি যার মাধ্যমে অসুস্থ লিভারকে সরিয়ে তার জায়গায় সুস্থ লিভার বসিয়ে দেওয়া হয়। লিভার যখন পর্যাপ্ত ভাবে কাজ করতে পারে না (লিভার বিকল হয়ে যায়) তখন লিভার প্রতিস্থাপন করার কথা ভাবা হয়।

প্রাপ্ত বয়স্কদের লিভার প্রতিস্থাপন করা হয় মূলত সিরোসিস হলে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন হয় বাইলিয়ারি আট্রেজিয়া হলে। ভাইরাল হেপাটাইটিস, লিভার ক্যান- সার ও বংশগত রোগ হলেও লিভার প্রতি- স্থাপন করা হয়ে থাকে।

প্রতিস্থাপন টিমঃ

লিভার প্রতিস্থাপন করাটা ঠিক হবে কি না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হয়।

এই টিমে থাকেনঃ

  • লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ (হেপাটোলজিস্ট)
  • প্রতিস্থাপনকারী সার্জন
  • প্রতিস্থাপন সমন্বয় রক্ষী
  • পুষ্টিবিদ
  • ফিজিওথেরাপিস্ট
  • মনোবিদ
  • অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট।

লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য একটি আদর্শ হাসপাতালের চেকলিস্ট সার্জারির জন্য অতি সূক্ষ্ম ভাবে নির্বীজন (অ্যাসেপ্টিক) ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, তাই ল্যামিনার ফ্লো থাকা পৃথক অপারেশন থিয়েটার ফেসিলিটিতে এটা করা হয়ে থাকে।

লিভার সার্জারির জন্য 320 স্লাইস CECT অ্যাঞ্জিওগ্রাফি ও ভলিউমেট্রি, আর্গন বিম ইত্যাদি আধুনিকতম প্রযুক্তির সঙ্গে CUSA ও ওয়াটার জেটTM ইত্যাদি লিভার রিসেকশন টুল ব্যবহার করা হয়।

দিন রাত সর্বক্ষণ ব্লাডব্যাঙ্ক খোলা থাকে
লিভার প্রতিস্থাপনের জন্য লিভার-দাতা ও লিভার-গ্রহীতা এই দুজনেরই শরীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য স্পেশ্যালাইজড প্যাথোলজি ও ইমিউনোলজির ব্যবস্থা রয়েছে।

হেপাটোবাইলিয়ারি ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট সর্বদা প্রস্তুত থাকে, ফোন করলেই হেপাটোবাইলিয়ারি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যায়, অ্যানেস্থেসিয়া স্টাফ ও স্পেশ্যা- লাইজড নার্সিং টিমকেও পাওয়া যায়।

লিভার প্রতিস্থাপন সার্জারি জীবিত লিভার দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন সার্জারিতে জীবিত ও সুস্থ দাতার লিভারের একটা অংশকে বের করে এনে গ্রহীতার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। ইহা সম্ভব হয় কেননা লিভারের ক্রিয়াশীলতাকে সংরক্ষণ করার ক্ষমতা বিশাল (70%) এবং এর পুনর্গঠিত হয়ে ওঠার ক্ষমতাও আশ্চর্য রকমের। দাতা ও গ্রহীতা দুজনেরই লিভারের অংশগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক আকৃতি পেয়ে যায়।

মৃত লিভার- দাতার লিভার নিয়ে প্রতিস্থাপন সার্জারিতে দাতার মস্তিষ্ক চির দিনের জন্য অকেজো হয়ে যায় এবং এই অবস্থার পুনরুদ্ধার করা যায় না। মৃত ব্যক্তির অন্যান্য প্রত্যঙ্গের মতো লিভারও দান করা হয় তাঁর নিকটতম আত্মীয়ের সম্মতি নিয়ে।

লিভার প্রতিস্থাপনের অপারেশন করতে সাধারণতঃ ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। অসুস্থ লিভারকে বের করে এনে তার জায়গায় দাতার লিভার বসানো হয়। নতুন লিভার প্রতিস্থাপন করার আগে সার্জন অসুস্থ লিভারকে পিত্তনালী ও রক্তনালী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন।

নতুন লিভার যাতে স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে থাকে এবং শরীর যাতে নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান করতে না-পারে, তার জন্য প্রতিস্থাপন পরবর্তী পরিচর্যা, যেমন ঔষধপত্র খাওয়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয় হাসপাতালে এবং বাড়িতে। সফল ভাবে লিভার প্রতিস্থাপন হলে পর একজন ব্যক্তি ফের তাঁর কাজের জগতে, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।

লিভার প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন কখন হয়?

গুরুতর লিভার রোগ হলেই লিভার প্রতি- স্থাপন করার প্রয়োজন হয়। এই রোগের নানা কারণ রয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্কদের লিভার প্রতিস্থাপন করার সব চেয়ে বড় কারণ হল সিরোসিস। এই সিরোসিস হলে লিভার আস্তে আস্তে খারাপ হতে থাকে এবং ক্রনিক আঘাতের ফলে অকেজো হতে শুরু করে। খারাপ কোষ কলা লিভারের সুস্থ কোষ কলার জায়গা দখল করে। এরা লিভার থেকে হওয়া রক্ত প্রবাহকে বাধা দেয় আংশিক ভাবে। সিরোসিস নানা কারণে হয়। যেমন হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস, মদ্য পান, লিভারের স্বয়ং-প্রতিরোধী রোগ, লিভারে চর্বি জমা হওয়া ও বংশগত লিভার রোগ। অত্যধিক মদ্য পান করার ফলে লিভারে সিরোসিস হওয়া বহু লোকেরও লিভার প্রতিস্থাপন করার দরকার হয়। বহু রোগীই আবার দীর্ঘ দিন লিভার প্রতিস্থাপন না-করেও বেঁচে থাকতে পারেন। তাঁদেরকে শুধু মদ্য পান থেকে বিরত থাকতে হয় এবং ০৬ মাস ধরে লিভার সংক্রান্ত নানা সমস্যার চিকিৎসা করাতে হয়। তবেই তাঁদের লিভার বেশ ভাল ভাবেই সুস্থ হয়ে ওঠে। যেসব রুগির লিভার রোগ খুব বেড়ে যায়, এবং বহু দিন ধরে মদ্য পান থেকে বিরত থেকে ও চিকিৎসা করা সত্ত্বেও যাঁদের লিভার সেরে ওঠে না, তাঁদের জন্য লিভার প্রতিস্থাপনই হল একমাত্র চিকিৎসা।

শিশুদের মধ্যে লিভার প্রতিস্থাপন করার সব চেয়ে বড় কারণ হল বাইলিয়ারি আট্রেজিয়া। সদ্যোজাত শিশুদের বাইলিয়ারি আট্রেজিয়া নামক এই বিরল রোগ হয় লিভার ও ক্ষুদ্রান্ত্রের মধ্যবর্তী অভিন্ন পিত্তনালী ব্লক হয়ে থাকলে বা এই পিত্তনালী একেবারেই না-থাকলে। লিভার থেকে পিত্তকে নিয়ে আসা পিত্তনালী না-থাকলে বা নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকলে বাধা প্রাপ্ত পিত্তগুলোর জন্যই সিরোসিস হয়। পিত্তর কাজ হল খাবারকে হজম করানো। এই রোগ ধরা না-পড়লে লিভার পরে পুরো অকেজো হয়ে যায়। তবে এই রোগ কেন হয়, তা জানা যায় না। এর এক মাত্র মোক্ষম চিকিৎসা হল নির্দিষ্ট কিছু সার্জারি বা লিভার প্রতিস্থাপন। লিভার ক্যানসার, বিনাইন (বিপজ্জনক নয়) লিভার টিউমার ও বংশগত রোগের ক্ষেত্রেও লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়।

Similar Posts

  • প্রতিরোধযোগ্য রোগের টিকা (ভ্যাক্সিনেশন)

    পোলিও, বা পোলিও মাইলাইটিস, একটি সংক্রামক ভাইরাল রোগ যা থেকে পক্ষা- ঘাত, স্থায়ী অক্ষমতা এবং এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। পোলিও টিকা (ভ্যাক্সিনে- শন) রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষার একটি কার্যকর উপায়। আপনি যদি টিকা (ভ্যাক্সিনেশন) মিস করেন তবে আপনার কি করা উচিত? ক্যাচ-আপ টিকা (ভ্যাক্সিনেশন): আপনি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই টিকার (ভ্যাক্সিনেশন) ডোজ মিস করেন,…

  • গলায় ক্যান্সারঃ যেসব লক্ষণে সতর্ক হওয়া জরুরি

    যে কোনো ক্যান্সারই শরীরের জন্য অনেক মারাত্মক একটি রোগ। সে গুলোর মধ্যে গলায় ক্যান্সারও অন্যতম। আর এটি হচ্ছে— এক ধরনের টিউমার জাতীয় রোগ।এই ক্যান্সার গলার কোষ থেকে শুরু হয়ে থাকে। আর মারাত্মক এ রোগটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই, হয়ে থাকে মদ ও ধূমপান করার কারণে। তবে এর বাইরেও বেশ কিছু কারণে, গলায় ক্যান্সার হতে পারে। যেমন—…

  • প্লেগ রোগ কি

    প্লেগ রোগ একটি প্রচন্ড ছোঁয়াচে ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ যেটা মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্য পায়ী প্রাণীদের আক্রমণ করে। মধ্য যুগে ইউরোপে এক সময় এই ব্যাধির জন্য হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়েছিল। এই মড়ক কালো মৃত্যু নামে পরিচিত। বর্তমানে, মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে এক ভাবে মানুষের প্লেগ হতে থাকে, কিন্তু ইহা আফ্রিকা এবং এশিয়ার দূরবর্তী ভাগে সব থেকে…

  • পোলিও কেন হয়

    ভাইরাসের মাধ্যমে পোলিও রোগ ছড়ায়। এই ভাইরাস শুধুমাত্র মানুষের শরীরে বেঁচে থাকতে পারে। পোলিও রোগের ভাইরাস পায়ু পথে অথবা মুখের সাহায্যে শরীরে প্রবেশ করে।অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা স্থানে এই ভাইরাস দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। পোলিওতে আক্রান্ত ব্যক্তির মল-মুত্র থেকে পোলিও ভাইরাস ছড়াতে পারে।পোলিও ভাইরাস আছে এমন খাবার, পানি ইত্যাদি গ্রহণের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পরে।…

  • বিষক্রিয়ার প্রাথমিক চিকিৎসায় করণীয়

    ডা. সজল আশফাক ১০:৪৪, ০৭ আগস্ট ২০১৮ ইমার্জেন্সি স্কোয়াডের ব্যবস্থা না থাকলে আপনি নিজেই রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। কেউ বিষপান করলে কিংবা বিষক্রিয়া ঘটলে প্রথমেই উচিত তাকে ধারে কাছের হাসপাতালে পাঠানো । তবে তার আগে জানতে হবে, রোগী বিষ বলে যা খেয়েছে তা আসলে কী? সে বমি করেছে কি না? তার বমির সঙ্গে পাতলা…

  • মুখে দুর্গন্ধ

    মুখে দুর্গন্ধ, যা করলে ৫ মিনিটে কমে যাবেঃ  মুখে দুর্গন্ধের কারণে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। দিনে দুবার ব্রাশ করার পরও, দুর্গন্ধ যেন থেকেই যায়। মুখ ঢেকে কথা বলা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।   কারও সঙ্গে মুখো মুখি কথা বলতে গেলে বিব্রত লাগে, হাসতেও পারেন না প্রাণ খুলে। আপনাকে নিয়ে কে, কি ভাবছে? এসব চিন্তা করে, সব…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *