কিডনিতে পাথর কেন হয়, কী করণীয়ঃ

পেটের ব্যথা প্রত্যাশিত কিছু নয়, কিন্তু তারপরও সাধারণ কোনো কারণে পেটব্যথা হতে পারে। ব্যথা খুব তীব্র হলে বুঝতে হবে ইহা জটিল কোনো রোগের লক্ষণ। যেমন- কিডনিতে পাথর। এই পাথর মূলত কিডনিতে পুঞ্জিভূত খনিজের শক্ত স্তূপ। 
শিকাগোতে অবস্থিত রুশ ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার কুগান মনে করেন, ১০ শতাংশ লোকের কিডনিতে পাথর হতে পারে। ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সি পুরুষদের কিডনিতে পাথর হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। যেসব লোকের কিডনিতে ইতোমধ্যে পাথর হয়েছে তাদের ১০ বছরের মধ্যে আরেকটি পাথর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

কিন্তু কিডনিতে পাথর হলে কীভাবে বুঝবেন? কিছু উপসর্গ আপনাদের এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিতে পারে।

হঠাৎ তীব্র ব্যথাঃ

প্রাপ্ত বয়স্কদের কিডনিতে পাথর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তখন ধরা পড়ে যখন তারা হঠাৎ তীব্র পেট ব্যথা বা পিঠ ব্যথা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান। পেট বা পিঠের এক পাশে প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে কিডনি পাথরের অন্যতম পরিচিত উপসর্গ। এ প্রসঙ্গে লুথেরান জেনারেল হসপিটালের ইমার্জেন্সি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডগলাস প্রপ বলেন, ‘কিডনির পাথরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যথা হঠাৎ করে আসে এবং তা খুব তীব্র হয়। অনেক নারী এ ব্যথাকে প্রসব বেদনার সঙ্গে তুলনা করেন।’
এই ব্যথা সাধারণ পিঠ ব্যথা ভেবে ভুল হতে পারে, কারণ ব্যথার শুরুটা পিঠের উপরিভাগ থেকে হয়। পাথর মূত্রাশয়ের কাছা কাছি চলে এলে ব্যথার অবস্থান নিচের দিকে নেমে আসবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হচ্ছেঃ

কিডনির পাথরের সঙ্গে সম্পৃক্ত পিঠ ব্যথা সাধারণ ব্যাক স্ট্রেইনের পিঠ ব্যথার মতো নয়, অর্থাৎ কিডনিতে পাথর জনিত পিঠ ব্যথার সঙ্গে নড়াচড়ার সম্পর্ক নেই।

কীভাবে বুঝবেন কোন কিডনিতে পাথর হয়েছে?

ডা. কুগান বলেন, ‘সাধারণতঃ যে কিডনিতে পাথর হয় ব্যথা সে পাশে হয়ে থাকে।’ কিডনির পাথরের আকারে তারতম্য হতে পারে। কিডনির পাথরের গড় আকৃতি ৫ মিলিমিটার। কিন্তু একজন লোক কত বেশি ব্যথা পাবে তা অবশ্যই কিডনির পাথরের আকারের ওপর নির্ভর করবে এমন নয়, এমনকি একটা ছোট পাথরও প্রচুর ব্যথায় ভোগাতে পারে।’

প্রস্রাবে রক্তঃ

কিডনিতে পাথরের আরেকটি সম্ভাব্য সতর্ককারী লক্ষণ হচ্ছে প্রস্রাবে রক্তের উপস্থিতি। মনে রাখতে হবে, প্রস্রাবে রক্তের উপস্থিতি কখনোই স্বাভাবিক অবস্থা নয়। উপসর্গ দেখা মাত্র পরীক্ষার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এছাড়াও অন্য লক্ষণ গুলো হচ্ছে- বমিভাব, বমি, ঘাম ঝরা, ব্যথায় বিবর্ণতা। কিডনির পাথর থেকে কখনো কখনো ইনফেকশনও হতে পারে। ইনফেকশনের একটি উপসর্গ হচ্ছে, শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া অথবা জ্বর।

শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাঃ

এক্স-রে, আল্ট্রাসাউন্ড অথবা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে কিডনিতে পাথর শনাক্ত করা যেতে পারে। ডা. প্রপ বলেন, ‘অধিকাংশ রোগীর কিডনিতে থাকা পাথর বের হয়ে যেতে পারে, ফলে তারা উপসর্গ থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে। কিন্তু কিছু পাথর অপসারণ করতে সার্জারির প্রয়োজন হয়। পাথর যত ছোট হবে এটি নিজে নিজে বের হয়ে আসার সম্ভাবনা তত বেশি।’

প্রতিরোধের উপায়ঃ

কিডনিতে পাথর প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা, কারণ পানি শূন্যতাকে কিডনিতে পাথরের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিদিন কতটুকু সোডিয়াম (লবণ) খাচ্ছেন লক্ষ্য রাখতে হবে। উচ্চ সোডিয়ামের ডায়েট প্রস্রাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে। ক্যালসিয়াম ও অক্সালেট বা ফসফরাসের সমন্বয়ে কিডনিতে পাথর তৈরি হয়। দৈনিক ২,৩০০ মিলিগ্রামের বেশি সোডিয়াম খাবেন না। আপনার অতীতে কিডনিতে পাথর হয়ে থাকলে সোডিয়ামে গ্রহণের পরিমাণ ১,৫০০ মিলিগ্রামের মধ্যে সীমিত করুন।

প্রাণীজ প্রোটিন সীমিতকরণও আপনাকে সাহায্য করতে পারে। লাল মাংস, পোল্ট্রি, ডিম ও সামুদ্রিক খাবারের মতো প্রাণীজ প্রোটিন অত্যধিক পরিমাণে খেলে শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ইউরিক অ্যাসিড হচ্ছে কিডনিতে পাথরের আরেকটি দায়ী উপাদান।

Similar Posts

  • ইউরিক এসিড কি, কেনো হয়, করণীয়

    উচ্চমাত্রার ইউরিক অ্যাসিডের কারণে গেঁটে বাত বা গিরায় গিরায় ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি অকেজো হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতিদিনের খাবারের মধ্যে কিছু আছে যে গুলোতে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি । আবার কিছু পুষ্টিকর খাবার আছে যে গুলো ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে ঔষধের মত কাজ করে। বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা আমিষ খেলে অথবা অ্যালকোহল…

  • থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে নিয়ন্ত্রণের উপায়

    থাইরয়েডের সমস্যায় নারী-পুরুষ উভয়ই ভুগতে পারেন। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রতি ১০০০ নারীর মধ্যে অন্তত ১৫ জন ও, ১০০০ পুরুষের মধ্যে ১ জন করে থাইর- য়েডের সমস্যায় আক্রান্ত। থাইরয়েড শরীরের এক বিশেষ গ্রন্থি। এটি স্বর যন্ত্রের দু’পাশে থাকে। থাইরয়েড গ্রন্থি দেখতে প্রজাপতির মতো। থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ হলো, শরীরের কিছু অত্যাবশ্য কীয় হরমোন (থাইরয়েড হরমোন) উৎপাদন করা।…

  • কিডনি সুস্থ রাখার উপায়

    শরীরের অন্যতম একটি গুরুত্ব পূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে কিডনি। এই অঙ্গটি ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব। এটি শরীরের তরল নিয়ন্ত্রণ করে, এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত বর্জ্য ও পানি অপসারণ করে, শরীরের রাসায়নিকের স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় রাখে। এই অঙ্গটির কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হলে বা এটি অসুস্থ হলে, তা শরীরে অনেক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। আর কিডনির রোগকে নীরব…

  • ইউরিক এসিড কি, কেনো হয়, করণীয়

    উচ্চ মাত্রার ইউরিক অ্যাসিডের কারণে গেঁটে বাত বা গিরায় গিরায় ব্যথা, উচ্চ রক্ত চাপ, কিডনি অকেজো হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতি দিনের খাবারের মধ্যে কিছু আছে যে গুলোতে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি।  আবার কিছু পুষ্টিকর খাবার আছে যেগুলো ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে, ঔষধের মত কাজ করে। বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা আমিষ খেলে অথবা…

  • মৃগীরোগ কি?

    মৃগীরোগ হল এক ধরণের স্নায়বিক ব্যাধিযা একজন ব্যক্তির বারবার খিঁচুনি ঘটায়। মস্তিষ্কে হঠাৎ অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়া কলাপের কারণে এই খিঁচুনি ঘটে যা মস্তিষ্কের কোষ গুলির মধ্যে মেসেজিং সিস্টেমে একটি অস্থায়ী ব্যাঘাত ঘটায়।প্রাথমিক লক্ষণ গুলির মধ্যে সাধারণতঃ খিঁচুনি অন্তর্ভুক্ত থাকে এবং সচেতনতা হারাতে পারে।মৃগী রোগের খিঁচুনি গুলির তীব্রতা একটি অন্তর্নিহিত ব্যাধির উপর নির্ভর করে যা মৃগী…

  • খাবারে বিষক্রিয়ার ঘরোয়া চিকিৎসা

     প্রতি দিন কত রকম খাবার খেতে হচ্ছে আপনাকে। কখনও ডাল-ভাত আবার কখনও বিরিয়ানি কখনও বার্গার আবার কখনও খিচুড়ি, ফুচকা। অফিসে কাজ করতে করতে কখনও চা, কখনও কফি। বাসায় থাকলেও টিভি দেখতে দেখেতে কখনও ঠাণ্ডা পানীয় আবার কখনও অন্য কিছু। সব সময় মুখ কিন্তু চলছেই। প্রতি দিনের বিভিন্ন ধরণের খাবারের মধ্যে কোন খাবারে কখন বিষক্রিয়া হয়,…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *