থাইরয়েড কেন হয়? প্রতিকারের উপায়

থাইরয়েড একটি গ্রন্থির নাম, যেটা গলার নিচের দিকে থাকে।

বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি চল্লিশ লক্ষ।

দেশে অন্য যে কোন রোগের চেয়ে থাইরয়েড রোগীর সংখ্যা বেশি।

থাইরয়েডের কাজ হল হরমোন সিক্রেট করা যা শরীরের কাজকে,

পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে থাইরয়েড গ্রন্থির নানা সমস্যা বিশ্বে,

অন্যতম হরমোন-জনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত।

হরমোন-জনিত রোগের ক্ষেত্রে ডায়া – বেটিসের পরই এর অবস্থান।

মূলতঃ নারীরাই এই সমস্যায় বেশি ভুগে থাকেন।

বাংলাদেশে মূলতঃ থাইরয়েড রোগ হওয়ার কারণ চারটিঃ

প্রথম কারণ হলোঃ

বাংলাদেশে আয়োডিনের অভাব রয়েছে।

আয়োডিনের অভাবের জন্য সাধারণতঃ থাইরয়েডের সমস্যা গুলো হয়।

তার ভিতর সব চেয়ে বড় সমস্যা হলো গয়টার।

গলার নিচের দিকে ফুলে যাওয়াকে গয়টার বলে।

এই গয়টার একটি বড় সমস্যা আমাদের দেশে,

সেই সাথে বাচ্চারা আয়োডিনের অভাবে ত্রুটি পূর্ণ ভাবে জন্ম গ্রহণ করে না ,

এবং বামনত্ব রোগ বরণ করে, মানসিক শারিরীক বিকাশ ঘটেনা।

দ্বিতীয় কারণ হলোঃ

জেনেটিক অর্থাৎ যদি মা, বাবা, দাদার থাকে অথবা পূর্ব পুরুষের,

থাকে সেই ক্ষেত্রে জেনেটিক লিংকে থাইরয়েডের সমস্যা হতে পারে।

তৃতীয়তঃ

থাইরয়েডের চিকিৎসার জন্য যদি কেউ রেডিও আয়োডিন খেয়ে থাকে,

তাহলে থাইরয়েডের সমস্যা হতে পারে।

চতুর্থতঃ

যদি গলার চার্জারী হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রেও,

থাইরয়েডের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই চারটিই মূলত,

আমাদের দেশে থাইরয়েডের সমস্যার মূল কারণ।

থাইরয়েডের চার ধরনের সমস্যা হয়ঃ

প্রথম কারণঃ

প্রদাহ,অর্থাৎ থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে যদি কোন ইনফেকশন হয়।

দ্বিতীয়ঃ হলো, থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতা।

তৃতীয়তঃ হলো থাইরয়েড হরমোন যদি অতিরিক্ত নিঃসরণ হয়। 

চতুর্থতঃ থাইরয়েড টিউমার বা ক্যান্সার।

এই চারটি সমস্যার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে ডাক্তাররা বলেন,

থাইরয়েড হরমোনের যে প্রদাহ এটা
সাধারণতঃ কোন ইনফেকশনের জন্য হতে পারে,

অথবা কোন ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস দিয়েও হতে পারে।

থাইরয়েড প্রদাহ হলে হঠাৎ করেই থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে অনেক ব্যথা হবে,

গলার ভিতর ব্যথা হবে হঠাৎ করে শরীরে কাঁপুনি দেখা দিবে,

চিমর দেখা দিবে এবং হঠাৎ প্রচুর ঘেমে যাবে।

সে ব্যপারটা বুঝতে পারবেনা যে তার সাথে কি হচ্ছে, মনে হবে যে হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে।

এটা হচ্ছে থাইরয়েড প্রদাহের মূল উপসর্গ।
আর যখন,

থাইরয়েড হরমোন কমে যায় তখন এটাকে হাইপো থাইরয়েড বলে।

এই রোগীর সংখ্যা বাংলাদেশে সব চেয়ে বেশি।

প্রতি সাত জনের মধ্যে পাঁচ জন নারী এই সমস্যায় ভোগেন।

এই সমস্যাকে ক্রনিক অটো ইমিউন থাইরো-ডাইটিস বলে।

হাইপো থাইরোয়েড হলে রোগী হঠাৎ করে মুটিয়ে যাবে,

গলার স্বর পরিবর্তন হবে, মানসিক দুশ্চিন্তা গ্রস্ত হবে এবং কোষ্ঠ কাঠিন্য হবে,

সেই সাথে মাসিকে পরিবর্তন আসবে অর্থাৎ তার মাসিক বেশি হতে পারে,

আবার কমও হতে পারে এবং সে খুব বেশি দুর্বল হয়ে যাবে,

সাথে সাথে তার কর্ম ক্ষমতা ধীর হয়ে যাবে। ঘুম প্রচুর হবে,

কিন্তু তার ঘুমের পরিপূর্ণতা হবেনা। তার চুল পড়ে যেতে থাকবে,

চামড়া ফ্যাকাশে হয়ে যেতে থাকবে আর সঙ্গে সঙ্গে এ্যালার্জির সমস্যা বেড়ে যাবে।

যৌন চাহিদা কমে যাবে। আর শিশুদের যদি হাইপো-থাইরয়ে-ডিজম হয়ে থাকে,

বিশেষ করে জন্মগত-ভাবে যদি শিশুর এই সমস্যা হয় তাহলে,

ঐ শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে কম নড়া চড়া করবে, তার চামড়া ফ্যাকাশে হবে,

এবং ঐ শিশু মুটিয়ে যাবে সাথে তার কোষ্ঠ কাঠিন্যও হবে।

এই ব্যপার গুলো দেখা গেলে ঐ শিশুর রক্ত পরিক্ষা করা জরুরি।

এ ছাড়া থাইরয়েড হরমোন যদি বেড়ে যায় সেই ক্ষেত্রে যদি,

হাইপার-থাইরয়ে-ডিজম দেখা দেয় সে ক্ষেত্রে তার হার্টবিট বেড়ে যাবে,

সে খাবে অনেক কিন্তু শুকিয়ে যাবে।

দ্বিতীয়তঃ তার পতলা পায়খানা হবে।

তৃতীয়তঃ তার চিমরের সাথে সাথে হার্ট বিট বেশি থাকার কারণে দৈনন্দিন কাজে,

তার সমস্যা হবে, তার শারিরীক দূর্বলতা দেখা দিবে,

এবং মানসিক দূর্বলতা দেখা দিবে। সে সাথে তার কর্ম ক্ষমতা কমে যাবে,

এবং ভবিষ্যতে সে যদি চিকিৎসার আওতায় না আসে তাহলে তার চোখ বড় হয়ে যাবে।

আর চোখ যদি বড় হয়ে যায় চোখ গুলো বের হয়ে যেতে থাকবে ফলে,

সে আর চোখ বন্ধ করতে পরবেনা এবং বাতাশ যাওয়ার কারণে সেখানে ইনফেকশন

হওয়ার সাথে সাথে আলসার হবে এবং এক সময় সে অন্ধত্ব বরণ করবে।

আর থাইরয়েড ক্যান্সারের রোগী সংখ্যায় একে বারে কম নয়।

যত রকমের ক্যান্সার হয় তার দুই থেকে তিন শতাংশ হয় থাইরয়েড ক্যান্সার।

ক্যন্সারের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হচ্ছে থাইরয়েড ক্যন্সার।

এটা হচ্ছে এক মাত্র ক্যন্সার যা ঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহন করলে পুরো পুরি ভালো হয়ে যায়।

থাইরয়েড ক্যন্সারের চিকিৎসাঃ

থাইরয়েড ক্যন্সারের চিকিৎসা সম্পর্কে চিকিৎসকরা বলেন,

থাইরয়েড ক্যান্সারের কিছু চ্যালেন্জ রয়েছে। প্রথমতঃ ডায়াগনোসিস।

ডায়াগনোসিসে এখন অনেক উন্নত প্রযুক্তি এসেছে বিশেষ করে,

আল্ট্রাসাউন্ড যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। এই আল্ট্রাসাউন্ডে,

নডিউল দেখে বলতে পারি থাইরয়েড ক্যন্সার হয়েছে কিনা,

বা কোন পর্যায়ে রয়েছে। এবং থাইরয়েড নির্ণয়ের,

আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে এলাস্টোস্ক্যান। অর্থাৎ ক্যান্সার নির্ণয়ে আল্ট্রাসাউন্ড।

এটার মাধ্যমে রং দেখে টিস্যু এ্যালাস্টিসিটি আলাদা করে আমরা বলতে পারি,

এতে ক্যান্সার আছে না নেই। আরেকটি মাধ্যম হচ্ছে এফএনএসি।

এফএনএসি করার আগে অবশ্যই এলাস্টোস্ক্যান করা উচিত,

কারণ এফএনএসি একটা নডিওল থেকেই করা যায়,

কিন্তু এলাস্টোস্ক্যান যদি পাঁচটা নডিওলে থাকে কোনটা,

ভালো আছে কোনটা মন্দ আছে সেটা আলাদা করা যায়।

এবং এতে কোন সুঁই ফোটানো হয় না, এতে কোন রক্ত পাত নেই।

থাইরয়েড ক্যান্সারে কখনোই কোন ক্যামো থেরাপিতে কাজ হবে না।

থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের যে টিস্যুটিতে ক্যান্সার হয়েছে শুধু সেটা ফেলে দিতে হবে,

কারণ পুরো গ্ল্যান্ড ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য অপারেশনের পর,

রোগীদের নিওক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারে আসতে হবে,

পোস্ট অপারেটিভ রেডিও অ্যাব্লেশান করার জন্য। আর পোস্ট অপারেটিভ রেডিও,

অ্যাব্লেশান শুধু নিওক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারেই হয়ে থাকে। 

থাইরয়েড ক্যান্সারের আরেকটি চিকিৎসা হচ্ছে সুই দিয়ে টিউমার অ্যাবলেট করা,

সুই দিয়ে আমরা টিউমার কেটে ফেলি এবং এই টিউমার বার্ণ করে দেই।

এটা ক্যান্সার হতে পারে আবার সাধারণ টিউমারও হতে পারে।

এটাকে বলা হয় মাইক্রো ওয়েব রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এব্লেসন।

হাইপো-থাই-রয়েড রোগী কী খাবে কী খাবে নাঃ

হাইপো-থাই-রয়েড রোগীর খাবারের বিধি নিষেধ নিয়ে,

রোগীদের কিছু খাবার খেতে নিষেধ ,
আবার কিছু খাবার বেশি খেতে বলা হয় ,

কারণ অয়োডিনের অভাবে রোগটা বেশি হয়ে থাকে।

যদি রোগির আয়োডিনের অভাবে রোগ হয় তাহলে,

সাপ্লিমেন্ট হিসেবে কিছু খাবার খেতে বলা হয়।

যেমনঃ সল্ট সাপ্লিমেন্ট অর্থাৎ আয়োডিন- যুক্ত খাবার খেতে বলা হয়।

টমেটো অবশ্যই খোশা সহ বেশি বেশি খেতে হবে, দুধ খাবে সেই সাথে চিংড়ি মাছ,

এবং শাক সব্জি খেতে হবে এবং অবশ্যই বেশি বেশি সামুদ্রিক মাাছ খেতে হবে,

কারণ এ গুলোতে প্রচুর পরিমাণ আয়োডিন থাকে।

দ্বিতীয়তঃ

কিছু খাবার বর্জন করতে বলা হয় কারণ,

এগুলো শরীরের আয়োডিনকে নষ্ট করে।

এ গুলো হলো বাঁধা কপি, ফুলকপি,

ব্রোকলি, সয়াবিন ও পালং শাক।

থাইরয়েডের চিকিৎসা পদ্ধতিঃ 

থাইরয়েডের চিকিৎসা যে কোন চিকিৎসার চেয়ে অনেক সহজ।

যদিও হাইপো থাই-রয়েডে সারা জীবন ঔষধ খেতে হয়,

অথবা হাইপার থাইরয়েডে টিউমার অ্যাবলেশান করলে আবার,

তা হাইপো হয়ে যায় সে জন্য দেখা যায় দুই ক্ষেত্রেই লম্বা সময় চিকিৎসা নিতে হয়।

তবুও, এর খরচ খুব কম। প্রতি দিন মাত্র একটা বা দু’টা ঔষধ খেলেই সুস্থ থাকা যায়,

যার মূল্য এক থেকে দুই টাকা মাত্র। সেই সাথে ফুড সাপ্লিমেন্ট তো নেয়াই যায়।
 
থাইরয়েড রোগীদের ক্যাল-সিয়ামের অভাব হয়, ইউরিক এসিড বেড়ে যাওয়া সহ,

কিছু ভিটামিন্স মিনারেলের অভাব হয়, বিশেষ করে রক্ত কমে যেতে পারে,

এজন্য কিছু শাক সবজি যদি খাবারের সাথে রাখা যায় এটাও একটা চিকিৎসার অংশ।

আর থাইরয়েড রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি অবশ্যই খুবই সস্তা এবং সারা জীবন নেওয়ার মত।

প্রতিদিন সকালে খালি পেটে আপনার প্রয়োজন মত ঔষধ খেয়ে নিবেন।

আর প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে টেবলেটের পরিমাণ একটু বেশি প্রয়োজন হয়।

এটা সব সময় খেয়াল রাখতে হবে। এই টেবলেট গুলো খুবই সহজ লব্য গ্রাম থেকে,

শুরু করে সব জায়গায় সহজেই পাওয়া যায়।

কারণ এই টেবলেট গুলো আমাদের দেশেই তৈরি হয়।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *