লিভার প্রতিস্থাপন করা কি সুরক্ষিত

লিভার প্রতিস্থাপন করাটা সুরক্ষিত। কারণ, লিভারের সংরক্ষণ ক্ষমতা খুব বেশি এবং এর একটা অংশ বের করে আনার পর (২-৩ মাসের মধ্যে) এটা পুনর্গঠিত হয়ে নিজের প্রকৃত আকৃতি পেয়ে যায়। দাতার স্বাস্থ্যে এর কোনও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে না, তাঁকে ২-৩ সপ্তাহের বেশি ঔষধ খেতে হয় না এবং এক মাসের মধ্যেই তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। তিন মাসের মধ্যে শ্রমসাধ্য কাজ (ভারী জিনিস তোলা ইত্যাদি) করতে পারবেন।

সার্জারির আগে ও পরে কী কী ধরনের বড়সড় ঝুঁকি দেখা দিতে পারে?

সার্জারির আগে সব চেয়ে বড় ঝুঁকি হল এটাই যে লিভারের রোগের কিছু গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে, যার ফলে রুগির সার্জারি করাই হয়তো সম্ভব না-হতে পারে। প্রতিস্থাপন করা হলে সার্জারি সংক্রান্ত যে কোনও ধরনের ঝুঁকিই থাকতে পারে। তার উপর আবার অসুস্থ লিভার বাদ দেওয়া এবং দাতার লিভার প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

রুগির ক্ষেত্রে সব চেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে এটাই যে কিছু সময়ের জন্য তাঁর লিভার হয়তো কোনও কাজই করবে না। সার্জারির ঠিক পরেই রক্ত পাত, প্রতিস্থাপিত লিভারের ঠিক ঠাক কাজ না-করা এবং সংক্রমণ ইত্যাদি বড় সমস্যা দেখা দিতে পারে। রুগির শরীর নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান করছে কি না তা দেখার জন্য রুগিকে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ভাল করে নজরে রাখতে হবে।

হাসপাতালে কী হয়?

আপনার জন্য কোনও লিভারকে শনাক্ত করার পর আপনাকে সার্জারির জন্য প্রস্তুত করা হবে। আপনি যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছবেন তখন আপনার অপারেশনের আগে আপনার অতিরিক্ত কিছু রক্ত পরীক্ষা, ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম ও বুকের এক্স-রে করানো হবে। আপনার লিভার যদি কোনও জীবিত দাতার থেকে নেওয়া হয়, তাহলে আপনাকে ও দাতাকে দুজনকেই একই সঙ্গে সার্জারি করা হবে।

আপনি সদ্যমৃত দাতার থেকে লিভার পেয়ে থাকলে সেই লিভার হাসপাতালে এসে পৌঁছনোর পরেই আপনার সার্জারি আরম্ভ হবে।

সার্জারি করতে কত সময় লাগে?

লিভার প্রতিস্থাপন করতে সাধারণত ০৪ থেকে ১৪ ঘণ্টা লাগে। অপারেশনের সময় সার্জনরা আপনার লিভারকে বের করে এনে তার জায়গায় দাতার লিভার বসিয়ে দেবেন। আপনার অসুস্থ লিভারকে বের করে আনার আগে সার্জন ওই লিভারকে আপনার পিত্ত- নালী ও রক্তনালী থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। লিভার থেকে প্রবাহিত রক্তকে মেশিনের সাহায্যে আটকে দিয়ে আপনার শরীরের বাকি অংশে তাকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সার্জন এর পর সুস্থ লিভারটাকে সঠিক জায়গায় বসিয়ে সেটাকে আপনার পিত্ত- নালী ও রক্তনালীর সঙ্গে যুক্ত করে দেন। প্রতিস্থাপনের অপারেশনটা খুব বড় সড় একটা চিকিৎসা পদ্ধতি বলে সার্জনরা আপনার শরীরের বিভিন্ন অংশে টিউব লাগিয়ে রাখেন। অপারেশনের সময় এবং তার পরেও আরও কয়েক দিন আপনার শরীর যাতে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করে যেতে পারে, তার জন্যই এই টিউবগুলোর প্রয়োজন হয়।

পুরো সুস্থ হয়ে ওঠার সময় কী হয়?

শুরুতে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে আপনার লিভার সহ পুরো শরীরের ক্রিয়া কলাপের উপর খুব ভাল করে নজর রাখার কাজটা করা হয়। রুগিকে একবার ওয়ার্ডে পাঠানো হয়ে গেলে ঘন ঘন তাঁর রক্ত পরীক্ষা করানোর মাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়, খাওয়া দাওয়া করতে দেওয়া হয়, পেশিকে ফের মজবুত করে তোলার জন্য ফিজিও থেরাপি করতে দেওয়া হয়। শরীর যাতে নতুন লিভারকে প্রত্যাখ্যান করতে না-পারে, তার জন্য শুরুতে শিরার মাধ্যমে এক বা একাধিক ঔষধ শরীরে ঢোকানো হয়, পরে আস্তে আস্তে ঔষধ খেতে দেওয়া হয়। প্রতিস্থাপনের সময় লিভারের ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করার জন্য এবং প্রত্যাখ্যানের কোনও লক্ষণকে শনাক্ত করার জন্য ঘন ঘন নানা টেস্ট করানো হয়।

লিভার প্রতিস্থাপনের পর মোটা মুটি দুই থেকে তিন সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়। কোনও কোনও রুগিকে আরও আগে ছেড়ে দেওয়া হয়। আবার, নতুন লিভার কেমন কাজ করছে এবং নতুন কোনও সমস্যা দেখা দিতে পারে কি না, এ সবের উপর নির্ভর করে কোনও কোনও রুগিকে হাসাপাতালে আরও বেশি দিন রাখা হয়।
এই দু ধরনের সম্ভাবনার জন্যই আপনাকে প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে। আপনাকে একবার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে রেগুলার নার্সিং ফ্লোরে পাঠিয়ে দেওয়া হলেই আপনাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া সংক্রান্ত ডিসচার্জ ম্যানুয়াল দেওয়া হয়। এতে লেখা থাকে যে বাড়ি ফিরে আপনাকে কী কী নিয়ম মেনে চলতে হবে। হাসপাতালে থাকাকালীনই আপনি আস্তে আস্তে খাওয়া দাওয়া করা শুরু করে দেবেন। প্রথমে আপনাকে স্বচ্ছ তরল খেতে দেওয়া হবে, তারপর আপনার নতুন লিভার কাজ করতে শুরু করলেই আপনাকে গোটা খাবার দেওয়া শুরু হবে।

জানতে পারবেন যে, কী ভাবে নিজের যত্ন নেবেন এবং নতুন লিভারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কী ভাবে নতুন ঔষধ পত্র খাবেন। এই সব কাজ নিয়মিত করতে করতে নিজেরই স্বাস্থ্য পরিচর্যায় একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রহণকারী হয়ে উঠবেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার আগে জানতে পারবেন যে লিভারকে শরীর প্রত্যাখ্যান করার এবং লিভারের সংক্রমণের লক্ষণগুলো কেমন হয় এবং কখন ডাক্তার ডাকা দরকার হবে তা-ও জানতে পারবেন। সুফল পাওয়ার জন্য প্রতিস্থাপনের পর যা যা নিয়ম মেনে চলতে বলা হবে সেগুলোকে ভাল করে মেনে চলার মতো ইচ্ছা রুগির মনে থাকতে হবে।

Similar Posts

  • স্ট্রোক হয়েছে কিনা বুঝবেন কী করে,জানুন লক্ষণঃ

    ব্রেনে যখন রক্ত এবং অক্সিজেন পৌঁছয় না তখন স্ট্রোক হয়। রক্ত আর অক্সিজেন ব্রেনে না পৌঁছানোর অর্থ হল সেখানে থাকা নার্ভ গুলোর মৃত্যু হওয়া। আর এটা হতে তিন থেকে চার মিনিট সময় নেয় মাত্র। স্ট্রোক হলে একাধিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। মানসিক এবং শারীরিক দুই রকমের জটিলতা হতে পারে। স্ট্রোক হলে রোগীর হঠাৎ অসম্ভব মাথা…

  • চোখের জ্যোতি বাড়াতে

    চোখের জ্যোতি বাড়াতে কয়েকটি খাবারের গুরুত্ব রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমেই ভিটামিন ‘এ’–এর কথা চলে আসে। বেশ কয়েক বছর আগের এক জরিপে আমাদের দেশে ভিটামিন -এর অভাবে শিশুদের অন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে তথ্য মিলেছে। এর সংখ্যাও কম নয়, ৩০ হাজারের মতো। এতেই বোঝা যায়, অন্ধত্বের সঙ্গে ভিটামিন এর সম্পর্ক নিবিড়। আবার দীর্ঘদিন ‘ক্র্যাশ’ ডায়েটের ফলেও দৃষ্টি…

  • কেন আপনার শিশুকে পোলিও টিকা দিবেন

    পোলিও একটি ভাইরাসবাহিত রোগ। তাই খুব দ্রুতই একজন থেকে অন্য জনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পোলিও রোগের কোন চিকিৎসা না থাকার কারনে সময়মত পোলিও টিকা দেওয়া ছাড়া পোলিও মুক্ত থাকার কিংবা পোলিও থেকে মুক্ত হওয়ার আর কোন উপায় নেই। দেশ থেকে পোলিও নির্মূল এবং সব শিশুর সুরক্ষার জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে পাঁচ বছরের নিচের সকল শিশুকে…

  • মাইল্ড স্ট্রোক হলে কি করবেন

    মাইল্ড স্ট্রোক মস্তিষ্কজনিত একটি রোগ। একে মিনি স্ট্রোকও বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্ত প্রবাহে জমাট বেঁধে এক ধরনের বাঁধার সৃষ্টি করে যার ফলে রক্ত প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটে। চিকিৎসা শাস্ত্রে একে বলা হয় স্কিমিক অ্যাটাক বা টিআইএ। এমন যদি হয় তাহলে যদিও মস্তিষ্ক সামান্য পরিমানে রক্ত ব্যবহার করে থাকে, কিন্তু মস্তিস্কের কোষ সমূহ…

  • গর্ভ ধারণে সমস্যা কেন হচ্ছে

    গর্ভ ধারণে সমস্যার নানা কারণ রয়েছে।স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের সমস্যা হতে পারে, হতে পারে যে কোন এক জনের। আমরা জেনে নেই, কি কি কারণ হতে পারে গর্ভ ধারণে সমস্যা — পুরুষের ক্ষেত্রে  কারণ সমূহঃ ০১) শুক্রাণু কম উৎপন্ন হলে, ০২) শুক্রাণু পুরো মাত্রায় নির্দিষ্ট বেগে গতিশীল না হলে, ০৩)  স্পার্ম বা শুক্রাণুর আকৃতি স্বাভাবিক না হলে, ০৪)  যৌন বাহিত…

  • কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে কী খাবেন, কী খাবেন না

    কোষ্ঠকাঠিন্য একটি বিরক্তিকর ও যন্ত্রণা দায়ক সমস্যা।  এক দিনে বা হঠাৎ করে কোষ্ঠ-কাঠিন্য হয় না।  অনেকের টয়লেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, কিন্তু পেট পরিষ্কার হয় না।  অস্বাস্থ্যকর এবং বাজে খাদ্যাভ্যাস, অপুষ্টিকর খাবার ইত্যাদির কারণে কোষ্ঠ কাঠিন্যর মতো অস্বস্তিকর সমস্যায় পড়ে থাকেন অনেকেই। কোষ্ঠকাঠিন্যটা কী?  এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রো- এন্টারোলজী বিভাগের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *