স্ট্রোকের ঝুঁকি মুক্ত থাকবেন যেভাবে

স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্ত ক্ষরণের ফলে অক্সিজেন সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে মস্তিষ্কের কোষ গুলো যখন দ্রুত ক্ষতি গ্রস্ত হয় সে অবস্থাকে স্ট্রোক বলে।

সারা বিশ্বে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষদের প্রতি ৪ জনের ১ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। কেউই জানি না আমার আপনার মধ্যে সেই ৪ জনের ১ জন রয়েছেন কি না! এক বার স্ট্রোক হলে অধিকাংশ-কেই পক্ষা ঘাত গ্রস্ত হয়ে বা অন্য শারীরিক অসুবিধা নিয়ে গৃহ বন্দি জীবন যাপন করতে হয়।

হাই প্রেশার, সুগার-সহ নানা রিস্ক ফ্যাক্টর মস্তিষ্কের রক্ত বাহী ধমনীর পথ আটকে দেয়। এদিকে রক্তের মধ্যে ভেসে বেড়ানো চর্বির ডেলা আচমকা ধমনীতে আটকে গিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের কোষ অক্সিজেনের অভাবে নিস্তেজ হতে হতে অকেজো হয়ে যায়। এই ব্যাপারটাই স্ট্রোক।

সাধারণতঃ, দু’ধরনের স্ট্রোক হয়।

ইসকিমিক আর হেমারেজিক। ইসকিমিক স্ট্রোকে রক্ত চলাচল থেমে যায়। আর হেমারেজিক স্ট্রোকে দুর্বল রক্ত নালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্ত পাত হয়। এ ছাড়া আছে ট্র্যান্সিয়েন্ট ইসকিমিক অ্যাটাক বা টিআইএ। কোনো ছোট রক্তের ডেলা মস্তিষ্কের রক্ত বাহি ধমনীতে সাময়িক-ভাবে আটকে গেলে কিছুক্ষণের জন্য রোগীর ব্ল্যাক আউট হবার ঝুঁকি থাকে। আপাত দৃষ্টিতে মারাত্মক না হলেও টিআইএ-র পরে বড় অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে।

চিকিৎসকের মতে, স্ট্রোক আটকানোর চেষ্টা করার পাশা পাশি রোগের লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা উচিত।

ইউরোপ-আমেরিকার চিকিৎসকদের মত, ১ ঘণ্টার মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তর মস্তিষ্কের জমাট বাঁধা রক্ত ক্লট বাস্টিং ঔষধ প্রয়োগ করে গলিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক করতে পারলে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। স্ট্রোকের ১ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা হলে সব থেকে ভাল ফল পাওয়া যায়, তাই এই সময়কে বলে ‘গোল্ডেন আওয়ার’। বিশেষজ্ঞদের কথায় সময় নষ্ট মানেই মস্তিষ্ক নষ্ট।

যত সময় বয়ে যাবে ততই মস্তিষ্কের কোষ অকেজো হয়ে গিয়ে রোগীর পক্ষাঘাত-সহ নানা সমস্যা বাড়বে। আর এই কারণেই গোল্ডেন আওয়ারের উপর এত গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্ট্রোকের লক্ষণ দেখলে যত দ্রুত সম্ভব কাছা কাছি ভাল হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করা উচিত বলে চিকিৎসকদের মতামত।

পৃথিবীর মোট ৮ কোটি স্ট্রোক আক্রান্ত পক্ষা-ঘাত-গ্রস্ত হয়ে নিজের, পরিবারের ও দেশের বোঝা হয়ে দিন যাপন করছেন। আমাদের দেশে স্ট্রোক আক্রান্ত পক্ষা-ঘাত- গ্রস্ত মানুষ ১ কোটি বা তারও বেশি। এই অসুখ সম্পর্কে সচেতন হলে ৯০% ক্ষেত্রে তা এড়িয়ে চলা যায়।

বিভিন্ন কারণে মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীর পথ সরু হয়ে গেলে এবং আচমকা চর্বির ডেলা আটকে রক্ত চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এ রকম হলে মস্তিষ্কের কোষ অক্সি- জেনের অভাবে নিস্তেজ হতে হতে অকেজো হয়ে যায়। এটাই স্ট্রোক। উচ্চ রক্তচাপ-সহ নানা ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীর পথ আটকে দেয়। দু ধরনের স্ট্রোক হয়, ইস্কিমিক আর হেমারেজিক। ইস্কিমিক স্ট্রোকে রক্ত চলাচল থেমে যায়।

হেমারেজিক স্ট্রোকে দুর্বল রক্তনালি ছিঁড়ে রক্তপাত হয়। এতে রয়েছে ট্র্যানজিয়েন্ট ইসকিমিক অ্যাটাক বা টিআইএ। কোনও ছোট রক্তের ডেলা মস্তিষ্কের রক্তবাহী ধমনীতে সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে রোগীর সামান্য কিছু সমস্যা ও ব্ল্যাক আউট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আপাত দৃষ্টিতে মারাত্মক না হলেও টিআই- এর পরে বড় অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকে। তাই কোনও অবস্থাতেই সামান্য সমস্যাও ফেলে রাখা উচিত নয়।

বিশ্বের ৩২টি দেশের বিভিন্ন রোগীর উপর সমীক্ষা করে ল্যান্সেট জার্নালে ফল প্রকাশিত হয়েছে। স্ট্রোকের জন্যে মোট ১০টি কারণকে দায়ী করা হয়। এদের প্রতিটিই প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিয়মিত চেক-আপ আর সতর্কতা মেনে রোজের জীবন যাত্রায় কিছু বদল আনলে আচমকা মারাত্মক স্ট্রোকের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

যেসব বিষয় মনে রাখতে হবেঃ

অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে (৪৮% ক্ষেত্রে)। যারা দিনভর বসে কাজ করেন, হাঁটা চলা-সহ কায়িক শ্রম নেই বললেই চলে তাঁদের এই রোগের ঝুঁকি বেশি ( ৩৬% ক্ষেত্রে)।

বাড়তি কোলে-স্টের-লের পরিমাণ স্বাভাবি- কের তুলনায় বেশি তাদেরও স্ট্রোকের সম্ভাবনা বেশি (২৭% ক্ষেত্রে)। পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে ভাজা ভুজি, ফাস্ট ফুড বেশি খেলে আচমকা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে (২৩% ক্ষেত্রে)। পেটে মেদ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে (১৯% ক্ষেত্রে)।

লাগাতার স্ট্রেস ও মানসিক অবসাদ-সহ অন্যান্য মানসিক সমস্যা স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ে ( ১৭% ক্ষেত্রে)। সিগারেট-সহ তামাক অন্যান্য অনেক অসুখের সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। নিয়মিত অতিরিক্ত মদ্যপানে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। হার্টের অসুখ থাকলে ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, ডায়েট বা শরীর চর্চা করেন না, তাদের স্ট্রোকের সমস্যা বেশি।
একটু সতর্ক হলে প্রতিটি রিস্ক ফ্যাক্টরকেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশেষ করে ব্লাড প্রেশার ও সুগার থাকলে নিয়মিত চেক-আপ ও শরীর চর্চা করে এবং সঠিক ডায়েট নিলে সার্বিক ভাবে ভাল থাকা সম্ভব।

চিকিৎসকের মতে, স্ট্রোক প্রতিরোধ করতে ওজন স্বাভাবিক রাখতে হবে। এ জন্য সুষম খাবার খাওয়া জরুরি। রোজকার ডায়েটে রাখুন পর্যাপ্ত পরিমাণে সব্জি ও ফল। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন আধ ঘণ্টা করে দ্রুত পায়ে হাঁটুন। রক্ত চাপের সমস্যা এবং সুগার থাকলে তা তো নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। আর ধূমপান-সহ সবরকমের তামাক সেবনকে বিদায় জানান আজই।

পেটে মেদ জমতে দেবেন না। ভুঁড়ি এবং নিতম্বের অনুপাত যে ০.৮৫ এর মধ্যে থাকে খেয়াল রাখতেই হবে। তাহলে আচমকা স্ট্রোক থেকে রেহাই পাবেন। স্ট্রোকের লক্ষণ হিসেবে কখনও হাঁটা-চলা বা ভারসাম্য রক্ষার সমস্যা, পড়ে যাওয়া, হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে ও বোঝাতে অসুবিধা হওয়া, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা ও মাথা ঘোরার মতো নানা উপসর্গ দেখা যায়।

অল্প স্বল্প লক্ষণ হলেও তা অবহেলা না করে নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নিলে পরবর্তীতে জটিলতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। মারাত্মক এই অসুখ সম্পর্কে সকলে সচেতন হন, স্ট্রোক মুক্ত থাকুন।

যত দ্রুত এর চিকিৎসা করবেন ততোই রোগীর জন্য ভালো, নাহলে মস্তিষ্কে চাপের কারণে রোগী প্যারালাইসিস হয়ে যেতে পারে। স্ট্রোকের দ্রুত চিকিৎসা হলে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠা সম্ভব।

Similar Posts

  • হাঁটু ব্যথায় ঘরোয়া প্রতিকার

    গরম বা ঠাণ্ডা ভাপ দেওয়া ছাড়াও ব্যথা কমানোর জন্য রয়েছে হরেক পন্থা।বয়স বাড়ার সঙ্গে হাড়ের জোড় ক্ষয় হওয়া থেকে হাঁটুর ব্যথায় ভোগা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আবার অপ্রত্যাশিত আঘাত, দুর্ঘটনা ও বিভিন্ন রোগের কারণে তরুণ ও মধ্য বয়স্কদের মাঝেও এই সমস্যা দেখা যায় প্রায়শই । কারণ যাই হোক না কেনো, হাঁটু ব্যথা দৈনিক জীবন…

  • কোলেস্টেরলের প্রয়োজনীয়তা

    প্রতিদিনের কার্য সম্পাদনের জন্য শরীরে যে পরিমাণ কোলেস্টেরল দরকার, সেই পরিমাণ কোলেস্টেরল আমরা খাবার থেকে গ্রহণ করতে পারি না বলে, শরীর নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নিজেই কোলেস্টেরল সংশ্লেষণ করে থাকে। আমরা কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবার থেকে যদি বেশি পরিমাণ কোলেস্টেরল গ্রহণ করি, তবে শরীর ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য কম পরিমাণ কোলেস্টেরল তৈরি করবে। ডিম, দুধ, বাটার…

  • পানি শূন্যতায় ভুগছেন কি না জেনে নিন ঘরোয়া পরীক্ষায়

    পানির অপর নাম জীবন, এ কথা সবার জানা থাকলেও অনেকেই হয়তো মানেন না! একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক পানির চাহিদা হলো ৩-৪ লিটার।অনেকেই দৈনন্দিন পানির এই চাহিদা হয়তো পূরণ করতে পারেন না বিভিন্ন কারণে । দীর্ঘ দিন এমনটি চলতে থাকলে এক সময় শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দেয় । অন্য দিকে শরীর থেকে অনেকটা পানি ঘাম…

  • ইউরিক এসিড কি, কেনো হয়, করণীয়

    উচ্চমাত্রার ইউরিক অ্যাসিডের কারণে গেঁটে বাত বা গিরায় গিরায় ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি অকেজো হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতিদিনের খাবারের মধ্যে কিছু আছে যে গুলোতে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি । আবার কিছু পুষ্টিকর খাবার আছে যে গুলো ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণে ঔষধের মত কাজ করে। বেশি পরিমাণে প্রোটিন বা আমিষ খেলে অথবা অ্যালকোহল…

  • থাইরয়েড

    থাইরয়েড হল একটি প্রজাপতির আকৃতির গ্রন্থি, যা ঘাড়ের শ্বাস নালীর (বায়ু প্রবাহ) সামনে থাকে। থাইরয়েডের কাজ হল হরমোন সিক্রেট করা যা, শরীরের কাজকে পরিবর্তন করে এবং নিয়ন্ত্রণ করে। থাইরক্সিন (T4) এবং Triiodothyronine (T3) হল থাইরয়েড হরমোন। এই হরমোন গুলি থাইরয়েড গ্রন্থি দ্বারাসরা সরি, রক্তে সিক্রেটেড হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ভ্রমণ করে। এই হরমোন গুলি…

  • ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে নতুন হাতিয়ার

    মানুষ হাসপাতালে যায় শরীর সারাতে৷ সেখানে গিয়েই যদি নতুন জীবাণু শরীরে ঢোকে এবং কোনো ওষুধ কাজে না লাগলে কী করা যায়! এমন মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া খতম করতে নতুন এক প্রক্রিয়ার পথে এগোচ্ছেন জার্মান বিজ্ঞানীরা৷ অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ যে সব জীবাণুর ক্ষতি করতে পারে না, হাসপাতালে সেগুলি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ জীবাণু কোথায় নেই! বিশেষ করে ঠিকমতো হাত…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *