কী কী কারণ লিভার প্রতিস্থাপনকে নষ্ট করে দিতে পারে

রুগির যে-সমস্যার জন্য লিভার প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হয়, সেই সমস্যাটাই প্রতিস্থাপিত লিভারের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। অপারেশনের আগেই যদি রুগি হেপাটাইটিস সি-র দ্বারা সংক্রামিত হয়ে থাকেব, তাহলে সেটাও প্রতিস্থাপিত লিভারকে নষ্ট করতে পারে। অন্যান্য কিছু সমস্যার মধ্যে রয়েছে লিভারের মধ্যে যাওয়া এবং লিভার থেকে বের হওয়া রক্তনালী বুজে যাওয়া অন্ত্রে পিত্ত নিয়ে যাওয়া নালী গুলো নষ্ট হয়ে যাওয়া।

প্রতিস্থাপন করার পরেও যদি কোনও ফল পাওয়া না-যায়?

মনে আশা রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি। লিভার প্রতিস্থাপনের অধিকাংশ অপা- রেশনই ভাল মতোই হয়। প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ প্রতিস্থাপিত লিভারই ১ বছর পরেও ভাল মতোই কাজ করে যাচ্ছে। কখনও কখনও লিভার সক্রিয় হয়ে উঠতে বেশি সময় নিয়ে নেয়। লিভার বিকল বিভিন্ন মাত্রায় হয়। লিভারের ক্রিয়াকলাপে খুঁত থাকলেও রুগিরা বেশ ভাল মতোই থাকে। যদি কোনও সমস্যা দেখা দেয়, যেমন নতুন লিভার কাজ করতে পারছে না, বা শরীরই তাকে প্রত্যাখ্যান করছে, সে ক্ষেত্রে ডাক্তার ও প্রতিস্থাপন টিম বিচার বিবেচনা করে দেখেন যে কাজ করতে অক্ষম প্রতিস্থাপিত লিভারটাকে বদলে দ্বিতীয় (বা এমনকী তৃতীয়) বার প্রতিস্থাপন করা যায় কি না। দুর্ভাগ্যবশত কিডনির মতো লিভারের ক্ষেত্রে ডায়ালিসিস করার মতো কোনও চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। নতুন লিভারের প্রতীক্ষায় থাকা রুগিরা যাতে তাঁদের বিকল লিভার নিয়েই বেঁচে থাকতে পারেন, তার জন্য ডিভাইস তৈরির টেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকরা।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কী ভাবে লিভারের যত্ন নেব?

হাসপাতালের প্রতিস্থাপন কেন্দ্র থেকে চলে যাওয়ার পরেও আপনাকে প্রায়ই ডাক্তারের কাছে আসতে হবে এটা জানার জন্য যে, আপনার নতুন লিভার ভাল মতো কাজ করছে কি না। আপনার নতুন লিভার প্রত্যাখ্যান, সংক্রমণ অথবা রক্তনালী বা পিত্তনালীর সমস্যার জন্য ক্ষতি গ্রস্ত হচ্ছে কি না জানার জন্য নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে। অসুস্থ লোকের সংস্পর্শ খুব সাবধানে এড়িয়ে চলতে হবে। অসুস্থতার কোনও লক্ষণ দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাবেন। দৈনন্দিন কাজ কর্ম করার মতো জোর আনার জন্য এবং সার্জারির আগের মতো সুস্থ শরীর ফিরে পাওয়ার জন্য বাড়িতে নানা পরিচর্যা নিতে হবে। এটা খুব দীর্ঘ ও ধীর একটা প্রক্রিয়া। এতে সহজ সরল কিছু কাজ করে যেতে হয়। প্রথমেই হাঁটা চলা করার জন্য কারও সাহায্যের প্রয়োজন হবে। ফুস ফুসকে সুস্থ রাখার জন্য এবং নিউমোনিয়া যাতে না হয় তার জন্য কেশে কেশে থুতু ফেলতে হবে এবং গভীর নিঃশ্বাস নেওয়া ব্যায়াম করতে হবে। প্রথমেই আইস চিপ্স খাওয়া শুরু করতে হবে, তার পর স্বচ্ছ তরল খাবার এবং সব শেষে গোটা খাবার। সব ধরনের খাদ্য গোষ্ঠীর খাবার থাকা সুষম আহার খেতে হবে। প্রায় ৩ থেকে ৬ মাস পরে কেউ যদি মনে করেন যে, তিনি কাজে যেতে পারবেন এবং তাঁর ডাক্তার যদি তাঁকে অনুমতি দেন, তাহলে তিনি কাজে যেতে পারেন। স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খাওয়া ও ব্যায়াম করা ছাড়াও মদ্য পান থেকে বিরত থাকতে হবে, বিশেষ করে মদ্য পানের জন্যই লিভার বিকল হয়ে গিয়ে থাকে। কোনও ঔষধ খাওয়ার আগে, এমনকী যেসব ঔষধ প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কেনা যায়, সেসব ঔষধও খাওয়ার আগে নিজের ডাক্তারকে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করে নেবেন যে, এগুলো খাওয়া যাবে কি না। নতুন লিভারের ভাল মতো যত্ন নেওয়ার জন্য ডাক্তার যা যা নিয়ম মেনে চলতে বলবেন, সেগুলোকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলাটা একান্ত দরকার।

লিভার প্রতিস্থাপন সফল ভাবে হওয়ার পর অধিকাংশ লোকই তাঁদের সুস্থ স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনের কাজ কর্ম আবার শুরু করতে পারেন। প্রতিস্থাপনের আগে কতটা অসুস্থ ছিলেন তার উপর নির্ভর করে শক্তি ফিরে পেতে কিছু সময় লাগবে। ডাক্তার বলতে পারবেন যে, পুরো সুস্থ হয়ে উঠতে কত সময় লাগতে পারে।

কাজ -‌> পুরো সুস্থ হওয়ার পর অধিকাংশ লোকই ফের কাজে যাওয়া শুরু করতে পারেন।

খাওয়া দাওয়া -> অধিকাংশ লোকই আগের মতোই খাওয়া দাওয়া শুরু করতে পারেন। কোনও ঔষধের জন্য ওজন বাড়তে পারে, কোনওটার জন্য ডায়াবেটিস হতে পারে আবার কোনওটার জন্য কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। পরিকল্পানা মাফিক খাওয়া দাওয়া করে এবং সুষম তথা কম চর্বি থাকা খাবার খেয়ে সুস্থ থাকতে পারবেন। লিভার প্রতিস্থাপন হওয়া রুগিদের শরীরে জল থেকে যায় বলে তাঁদের ওজন বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে । শরীরে জলের মাত্রা কমা- নোর জন্য বা একে বারে শূন্য করার জন্য এই রুগিদের লবণ কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ব্যায়াম -> লিভার প্রতিস্থাপন সফল হওয়ার পর অধিকাংশ লোকই শারীরিক কসরত করতে পারেন।

যৌনতা -> লিভার প্রতিস্থাপনের পর অধিকাংশ লোকই স্বাভাবিক যৌন জীবনে ফিরে আসতে পারেন। মহিলাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিস্থাপনের পর এক বছরের মধ্যে তাঁরা যেন গর্ভবতী হয়ে না-পড়েন। প্রতিস্থাপনের পর যৌন জীবন ও প্রজননের ব্যাপারে কী করা যেতে পারে সেসব কথা নিজের প্রতিস্থাপন টিমকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। যে কোনও কিছুই নতুন করে শুরু করার আগে ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে বিশদে সব জেনে নিন।

Similar Posts

  • লিভার ফেইলিউর রোধে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণ জরুরি

    লিভার ফেইলিউরের ভয়াবহতা, চিকিৎসার সুযোগ সুবিধা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে লিভারের কার্য- ক্ষমতা যখন কমে যায় অথবাশরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী যখনই ইহা কাজ করতে পারে না তখনই ইহাকে লিভার ফেইলিউর বলা হয়।  একে তিন ভাগে ভাগ করা যায়ঃ  এক. আকস্মিক ফেইলিউর,  দুই. দীর্ঘমেয়াদি ফেইলিউর,  তিন. দীর্ঘমেয়াদি আকস্মিক ফেইলিউর। আর ভয়াবহের মধ্যে যদি আমরা ভাগ করি তাহলে…

  • পোলিওমুক্ত বাংলাদেশ

    ২৭ মার্চ ২০১৪ তারিখে “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা” বাংলাদেশকে পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এই সংস্থাটির দিল্লী কার্যালয় থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশকে পোলিও মুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর এ দেশে সর্ব শেষ পোলিও রোগী পাওয়া যায়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে বাংলাদেশকে তখন পোলিও মুক্ত ঘোষণা করা হয়নি।…

  • যত সমস্যা দাঁতের রোগ থেকে

    দাঁত ও মুখের সু স্বাস্থ্য রক্ষা কি কেবল সৌন্দর্যের জন্য? না, তা নয়। দাঁতের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেহের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সু স্বাস্থ্য। মুখের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে দেহের গুরুত্ব পূর্ণ সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। যেসব রোগ হতে পারেঃ আলঝেইমারঃ মুখের রোগের সঙ্গে আলঝেইমার বা স্মৃতি ভ্রমের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন…

  • |

    থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ

    থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্ত স্বল্পতা জনিত রোগ। ইহা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। রক্তের ক্যানসারও নয়। প্রকারভেদঃ ক্লিনিক্যালি থ্যালাসেমিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যেমন-থ্যালাসেমিয়া মেজর, মাইনর এবং ইন্টার মিডিয়েট।থ্যালাসেমিয়ার অনেক প্রকারভেদ আছে। যেমন-বিটা থ্যালাসেমিয়া, ই-বিটা থ্যালাসে- মিয়া, হিমোগ্লোবিন ই-ডিজিজ, আলফা থ্যালাসেমিয়া, এস বিটা থ্যালাসেমিয়া, হিমোগ্লোবিন এস ডিজিজ, হিমোগ্লোবিন ডি পাঞ্জাব, হিমোগ্লোবিন ডি আরব ইত্যাদি।…

  • রাতে পা কামড়ানোর কারণ ও প্রতিকার

    সারারাত পা ‘কামড়ায়’। ফলে ঘুম হয় না ঠিক মতো। এ রকম হওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। রাতে পায়ের ‘কাফ’ বা পেছনের পেশিতে এবং পায়ের পাতায় প্রচণ্ড ব্যথায় নির্ঘুম রাত কাটান কিছু মানুষ। সারাদিন কোনো ব্যথা নেই, রাতে হলেই এই ব্যথা হানা দেয়। মাঝে মধ্যে ব্যথা উরুতেও উঠে আসে। কখনও ব্যথার তীব্রতা এতই বেড়ে যায়…

  • দাঁতে গর্ত হলে

    দাঁতে গর্ত এবং মাঝে মধ্যেই ব্যথা হলে ;দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। ফেলে রাখলেই ছড়িয়ে যায় দাঁতে সংক্রমণ। যা প্রাণ সংশয়ও ডেকে আনতে পারে। এমনিতেই দীর্ঘ দিন ধরে দাঁতের সমস্যা ফেলে রাখলে অনেক বিপত্তি।  তাই যদি ডাক্তার বলেন দাঁত তোলা কিংবা রুট ক্যানাল (Root Canal Treatment),করা ছাড়া কোনও উপায় নেই তাহলে দেরি করা মানে জেনে বুঝে বিপদ ডেকে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *